বিবিএন শিরোনাম

শিক্ষা নিয়ে কিছু কথা

ডেস্ক নিউজ#

বইয়ের বোঝা ও মুখস্থবিদ্যা এ দু’টি বিষয়ে আমাদের অভিভাবকদের বেশি দায়ী করা যায় না। শিক্ষা কারিকুলামে বইয়ের সংখ্যার ব্যাপারে যথাযথ নীতিমালা আমাদের শিশুদের বইয়ের বোঝা থেকে রক্ষা করতে পারে এবং শিক্ষাপদ্ধতি দিতে পারে আমাদের মুখস্থবিদ্যা থেকে মুক্তি। শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা আছে, মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের ও অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক কর্মকুশল নাগরিক তৈরি করা। তার সাথে শিক্ষার মাধ্যমে জাতিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে চলার দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মুখস্থের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ হয় না। শিক্ষার্থীরা নির্বাচনকৃত বিষয় মুখস্থ করতে থাকে। তারা একটি বিষয়ের শতকরা মাত্র ২০ থেকে ২৫ ভাগ বুঝে এবং বাকি ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ না বুঝেই পরীক্ষায় এ প্লাস অর্জনে সক্ষম হয়। এতে অবশ্য আমরা অভিভাবকেরা সন্তুষ্ট থাকি। কিন্তু ধরা খাই যখন প্রতিযোগিতামূলক কোনো পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস মার্ক তুলতেও ব্যর্থ হয় সন্তান বা পোষ্য। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কয়েক বছর ধরে আমরা এটাই প্রত্যক্ষ করছি। এ প্লাস, গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্ক তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এ প্লাস পাওয়া কিছু শিক্ষার্থীকে সাংবাদিকেরা দেশের জাতীয় বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করলে তারা এর উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। অথচ জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি সম্পর্কিত প্রশ্ন দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরই জানার কথা। যা হোক, এমন প্রজন্ম নিয়ে আমাদের স্বপ্ন-প্রত্যাশা কতটা হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষাব্যবস্থার এমন মৌলিক গলদ নিরসনে হাইকোর্টের এক রায়ে শিশুর ওজনের দশ ভাগের এক ভাগের বেশি বইয়ের ব্যাগের ওজন হবে না- এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন আছে। আমরা আশা করি, তা আইন আকারে পাস হয়ে আসলে তা বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগী হবে। আর বিশেষ করে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো তা কার্যকর করায় ভূমিকা রেখে শিশুদের বইয়ের বোঝা কমাতে সফল হবে। সাথে সাথে মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মুখস্থবিদ্যা দূর করতে হবে।
সৃজনশীল পদ্ধতি যখন শুরু হয় তখন ধারণা করা হয়েছিল দেশে শিক্ষার বিপ্লব হবে, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক মানুষ গড়ে উঠবে; কিন্তু কাজ আসলে তেমন কিছুই হচ্ছে না। শিশুরা চমক লাগানো গাইড বই কিনে তা গলাধঃকরণ করছে মাত্র। আমেরিকান শিক্ষাবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন স্যামুয়েল ব্লুম ১৯৫৬ সালে শিক্ষার্থীদের চিন্তন শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছয়টি স্তরে ভাগ করে সৃজনশীল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তা ছিল ১. জ্ঞান ২. উপলব্ধি ৩. প্রয়োগ ৪. বিশ্লেষণ ৫. মূল্যায়ন ৬. সংশ্লেষণ। এই ছয় স্তরকে চারটি স্থানে সন্নিবেশিত করে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় প্রাইমারি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লাখ লাখ টাকা ডোনেশনের বিনিময়ে নানা প্রকাশনীর বই পাঠ্য করে শিক্ষার্থীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা তা থেকে হুবহু মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করে। তাহলে শিক্ষকেরই বা আর দরকার কী? ক্লাসেও শিক্ষক এসব গাইড বই পড়ান এবং তা থেকে শিক্ষার্থীদের পড়া দাগিয়ে দেন। মন্ত্রীসহ সবাই সৃজনশীলতা আশা করছেন কিন্তু অসৃজনশীল নানা উপকরণের অবাধে সয়লাব বন্ধ করতে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন। গাইড বইগুলো বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ক্লাসে পাঠদানে মনোযোগী করার ব্যতিক্রমী পদ্ধতি বের করতে হবে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানলাভের পরিবেশ সব প্রতিষ্ঠানে তৈরি করার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত করলে আশা করা যায়, শিক্ষার উন্নয়নে নেয়া পদক্ষেপ সার্থক হবে। আগামীর শিশুরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত থাকবে, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।