রমজান জাকাত আদায়ের প্রকৃষ্ট সময়

ডেস্ক নিউজ#
ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের অধিপতি মহান আল্লাহতায়ালার অসংখ্য নামের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘রব’। আল্লাহ শুধু রব নন, তিনি ‘রাব্বুল আলামিন’ তথা জগতের পালন কর্তা। তিনি সৃষ্টিকে ভালোবেসে সৃষ্টির কল্যাণে সব প্রয়োজনের আয়োজন করে থাকেন। তিনি করুণার আঁধার, মানবজাতি তথা সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ কিসের মাঝে নিহিত সে সম্পর্কে তিনিই সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। পার্থিব কল্যাণ আর পারলৌকিক নাজাতের জন্য কাঙ্ক্ষিত, নিরাপদ ও শান্তির পরম সৌধ হলো ইসলাম। মানবতার মহান মুক্তিদূত মহানবী (সা.) সেই পরম সৌধের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ হিসেবে পাঁচটি বিষয়কে উল্লেখ করেছেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বিবৃত রাসূলের (সা.) বাণী- ‘বুনিয়াল ইসলামা আলা খামসিন’ অর্থাৎ ইসলাম পাঁচটি ভিত্তিমূলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের পাঁচ ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাকাত ও রমজান; পবিত্র হাদিসে যা তৃতীয় ও পঞ্চম স্থানে বিবৃত হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নামাজ, যা মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও পাপাচার থেকে নিবৃত্ত করে। কোরআনে কারিমে অন্তত ৮২ জায়গায় ‘আকিস্ফমুস সালাত ওয়া আতুয্যাকাত’ অর্থাৎ নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত দান করো (২ :৪৩) বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাকাতের পর হজের স্থান, যা পরিশুদ্ধ আত্মার একান্ত প্রত্যাশার ইবাদত। নামাজ, জাকাত, হজ ও মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা- এ চারটি বিষয়কে শক্ত ভিত্তিমূলের ওপর দাঁড় করাতে প্রথমেই যাকে স্থান দেওয়া হয়েছে সেটি হলো, মহান সত্তার একত্ববাদের ঘোষণা এবং তার প্রেরিত রাসূলের সত্যায়ন। তাওহিদ ও রেসালতের স্বীকৃতি দিয়ে বান্দাহ নামাজের মাধ্যমে নিজের শারীরিক ও আত্মিক উন্নয়ন ঘটায় এবং জাকাত প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পরিশুদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি আনয়ন করে। আর সেটি যদি সংযম ও সহানুভূতির মাস রমজানে প্রদান করা হয়, তবে সেটি সর্বোত্তম দান হিসেবে পরিগণিত হবে।’জাকাত’ শব্দটির বাংলা ভাষান্তরে আধিক্য, পবিত্র, উৎকর্ষ সাধন, প্রবৃদ্ধি, বরকত, ক্রমবৃদ্ধি, লাভ, প্রশংসা প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করা যায়। জাকাত এমন একটি সংবেদনশীল আর্থিক ইবাদত, যা আর্থিকভাবে অসচ্ছল বান্দার অধিকার পূরণার্থে সামর্থ্যবান তথা নির্ধারিত সম্পদের মালিক সচ্ছল ব্যক্তিবর্গের প্রতি মহান আল্লাহ নির্দেশিত অবশ্য পালনীয় বিষয় হিসেবে সংবিধিবদ্ধ। জাকাত আদায় করলে সম্পদে ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি ঘটে এবং পাশাপাশি বিচিত্র উপায়ে অর্জিত সম্পদ পবিত্রতার আবহে বরকতমণ্ডিত হয় বলে এর স্বতন্ত্র ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। রমজানের সঙ্গে জাকাতের এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। কেননা, রোজা হচ্ছে দেহের জন্য জাকাতস্বরূপ। সম্পদের যে রূপ জাকাতের বিধান রয়েছে, তদ্রূপ শরীরের জাকাত হিসেবে রোজাকে গণ্য করা হয়ে থাকে। যদিও জাকাত প্রদানের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই; তথাপি মাহে রমজানে জাকাত প্রদান নানা দিক থেকেই উত্তম ও তাৎপর্যময়। একদিকে রোজা পালনের মাধ্যমে দৈহিক জাকাত চলমান থাকে, অন্যদিকে সম্পদের ওপর জাকাত প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক জাকাতও পবিত্র এ মাসে প্রদানের সমান্তরাল সুযোগ লাভ করা যায়। এমনিতেই মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত খুব মূল্যবান ও বরকতের; তাই রোজাব্রত অবস্থায় জাকাত প্রদান করলে রোজার মূল্য ও রোজাদারের বরকত অধিকতর বৃদ্ধি পায়। পুণ্যের দিকটি বিবেচনায় নিলেও তা সময়োপযোগী। কেননা, মাহে রমজানে একটি নফল একটি ফরজের সমান সওয়াব বয়ে আনে এবং একটি ফরজ অন্য সময়ের ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব ও মর্যাদায় উন্নীত হয়। সম্পদের জাকাত আবশ্যক ইবাদত হিসেবে যেহেতু প্রদান করতেই হবে, তাই সেটি রমজানের পবিত্র ও বরকতময় সময়ে প্রদান করলে তা অধিক পুণ্যার্জনের পথ সুগম করে দেয়।

বিপন্ন মানবতার স্বার্থে কোরআনে কারিমের বাণী- ‘ওয়াফি আমওয়ালিহিম হাক্কুল লিস্সাইলি ওয়াল মাহরুম’ অর্থাৎ তোমাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে (৫১ :১৯)। এই অধিকার হচ্ছে জাকাত, দান, সাদকা, ফেতরা বা অন্য কোনো উপায়ে প্রদত্ত আর্থিক সহযোগিতা। জাকাতের সঙ্গে সম্পদে বরকত এবং প্রবৃত্তির পরিশুদ্ধতার বিষয়টি জড়িত। আর মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মূল কথাটিও হচ্ছে ‘লাআল্লাকুম তাত্তাকুন’ অর্থাৎ পরহেজগারি অবলম্বন করতে পারা, খোদা-ভীরুতা অর্জন করা, যা আত্মার পরিশুদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতেই আসতে পারে। সুতরাং রমজান ও জাকাতের যুগপৎ অবস্থান মৌলিকত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত। এ ছাড়া সহানুভূতির মাস হিসেবে সংজ্ঞায়িত রমজানে জাকাত প্রদানের মাধ্যমে অভাবী, প্রার্থী, ফকির-মিসকিন ও বঞ্চিতদের প্রতি পুরোপুরি মমত্ববোধ ও সহানুভূতি প্রকাশের বিষয়টিও সার্থক রূপ লাভ করে।

পবিত্র কোরআনে মানবসম্পদের বণ্টন প্রক্রিয়ার মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে এভাবে- ‘লায়াকুনা দওলাতাম বাইনাল আগনিয়াই মিনকুম’ অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, ঐশ্বর্য বা সম্পদ কেবল তাদের মধ্যেই যেন আবর্তিত না হয় (৫৫ :৭)। এখানে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার এক মানবতাবাদী পদ্ধতি নির্দেশ করা হয়েছে; জাকাতের হক আদায় করে যা সম্পন্ন করা যায়। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বিবৃত এক হাদিসে কুদসিতে রয়েছে- ‘হে আদম সন্তান, তুমি দান করতে থাক, আমিও তোমায় দান করব।’ আল্লাহর বাণী- ‘খুয্ মিন আমওয়ালিহিম সাদাকাতান তুতাহ্হিরুহুম ওয়া তুযাক্কিহিম বিহা’ অর্থাৎ সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে জাকাত গ্রহণ করো, যেন তুমি এর মাধ্যমে তাদের সম্পদকে পবিত্র ও পরিশোধিত করতে পার (৯ :১০৩)। প্রভুর সন্তুষ্টি বিধানে যে জাকাত প্রদান করা হয়ে থাকে তাতে সম্পদের বৃদ্ধি পায় এবং তারাই সমৃদ্ধশালী হয় (৩০ :৩৯)। এসব ঐশী নির্দেশনার বিশ্লেষণে আমরা যদি মহানবীর (সা.) বক্তব্যের সমন্বয় ঘটাই, তবে আরও পরিষ্কাররূপে যা দেখতে পাব- ‘যদি কেউ তার সম্পদের জাকাত আদায় করে, তবে নিশ্চিতরূপে তার সম্পদ হতে যাবতীয় অকল্যাণ দূরীভূত হবে এবং সম্পদে প্রবৃদ্ধি আসবে।’ আর সেই প্রবৃদ্ধি পুণ্যার্জন ও বরকতের মাস রমজানে আরও বহুলাংশে বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে রাসূলের (সা.) বাণীর উদ্ধৃতিই যথেষ্ট- ‘রমজান মাসে এক দিরহাম দান-খয়রাতের বিনিময়ে সহস্র দিরহামের সমপরিমাণ পুণ্য প্রদান করা হয়।’ এটি কখনও সওয়াবের মাত্রায় আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই আমরা নিদ্বর্িধায় বলতে পারি- পবিত্র মাহে রমজানই হলো জাকাত প্রদানের প্রকৃষ্ট সময়।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।