বিবিএন শিরোনাম

ইয়াবা পাচারের নিরাপদ রুট বাইশারী-ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়ক

নিজস্ব প্রতিবেদক #
আনসার সদস্য হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করলেও অল্পতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে চাকরি ত্যাগ করেন। শুরু করেন মিয়ানমারের চোরাই পণ্যের ব্যবসা। এক সময় জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা পাচারে। নির্বিঘেœ ইয়াবা ব্যবসা করে আয় করছেন কোটি কোটি টাকা। হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। তকমা লাগিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরও। তিনি হচ্ছেন রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমদ ওরফে ইয়াবা মোস্তাক। তার বাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব গোয়ালিয়াপালং এলাকায়। তাঁর বাবা আশরাফ মিয়া পেশায় একজন সাধারণ কাঠুরিয়া। কয়েক বছর আগেও খেয়ে না খেয়ে জীবন গেছে তাদের। কিন্তু এখন ইয়াবার কল্যাণে কাঠুরিয়া বাবার সংসারকে কোটিপতির কৌটায় নিয়ে গেছেন মোস্তাক।   জানা গেছে, দরিদ্র বাবার টাকায় অল্প পড়াশোনা করে আনসার বাহিনীতে যোগ দেন মোস্তাক আহমদ। ছোট বেলা থেকেই লোভী প্রকৃতির ছিলেন তিনি। একারণেই মাত্র তিন বছর পর ছেড়ে দেন অল্প বেতনের আনসার সদস্যের চাকরি। এরপর তাঁর বড় ভাই মনসুরের হাত ধরে মিয়ানমারের চোরাই পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন। শুরু থেকেই মিয়ানমার সীমান্ত থেকে চোরাই পথে কাপড়, আচার, বিয়ার, মদসহ নানা পণ্য নিয়ে আসে। টানা এক বছর চোরাই পণ্যের ব্যবসা করে সীমান্তের সকল অবৈধ অনুপ্রবেশ পথ রপ্ত করেন। এক পর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা পাচারে। সামান্য পরিমাণ ইয়াবা নিয়ে পাচার শুরু করে মোস্তাক। শুরুর দিকে তিনি নিজেই পাচার করতেন। ওই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে খুচরা বিক্রি করতেন ইয়াবা।
জানা গেছে, মোস্তাকের বড় ভাই মনসুর গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুরগী সংগ্রহের ব্যবসা করে। ভাইয়ের সাথে মুরগী সংগ্রহের আড়ালে মোস্তাক খুচরা ইয়াবা বিক্রি শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে পাচার বৃদ্ধি করেন। এক সময় শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীতে পরিণত হন মোস্তাক আহমদ।
সূত্রমতে, ইয়াবা জগতে মোস্তাক পা দেন হ্নীলার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদের হাত ধরে। মোস্তাক ছিলেন নুর মোহাম্মদের অন্যতম সহযোগি। তবে পুলিশের ক্রস ফায়ারে নুর মোহাম্মদ নিহত হওয়ার পর ওই সিন্ডিকেট ছেড়ে নিজেই একটি ইয়াবা পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন মোস্তাক। সিন্ডিকেটে মোস্তাকের অন্যতম সদস্য হিসাবে রয়েছে তাঁর বড় ভাই মনসুর, ঈদগড় ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধির ভাই হাফেজ শহিদুল ইসলাম, খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবু তাহের টুলু, সাংবাদিক মো. সেলিম, আরমানসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। এর মধ্যে সাংবাদিক সেলিম ৪০ হাজার ইয়াবাসহ স্বস্ত্রীক চট্টগ্রামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে আটক হয়। এখনও তিনি কারাগারে রয়েছেন। ওই ইয়াবা গুলো ছিল মূলত মোস্তাকের। টেলিভিশনের লগুসহ গাড়ি ব্যবহার করে ইয়াবা পাচার করতেন সেলিম। অবশ্য সেলিম আটকের পর যে ক’জনের জড়িত থাকার নাম উঠে আসে তার মধ্যে মোস্তাক আহমদ অন্যতম। তবে ঈদগড় ইউপির এক শীর্ষ জনপ্রতিনিধির ভাই শহিদুল ইসলাম এখনো অধরা। তিনিও বর্তমানে বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা।
জানা গেছে, মোস্তাক সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ঈদগড়ের শহিদুল ইসলাম। ইয়াবা ব্যবসার টাকা জামায়াতের নাশকতা কর্মকান্ডে ব্যবহার করে জামায়াতের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্যক্তি’ হয়ে উঠেছেন শহিদুল ইসলাম। অথচ এক সময় আর্থিকভাবে মারাত্মক অস্বচ্ছল ছিলেন তিনি। তবে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। বাইশারি এলাকায় কোটি কোটি বিনিয়োগ করে শত শত একর রাবার বাগান গড়ে তুলেছেন। নিজের টাকা খরচ করে আপন ভাইকে জনপ্রতিনিধি  বানিয়েছেন। কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় শহিদুল ইসলামের একটি বহুতল ভবন রয়েছে। বর্তমানে ওই ভবনে ইয়াবা গোডাইন গড়ে তুলা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঈদগড়ের এক ব্যক্তি বলেন, বছর খানেক আগে মোনাফ নামে কক্সবাজার শহরের এক শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীর সাথে তার দ্বন্দ্ব লাগে। পরে মোনাফ নামের ওই ব্যক্তি শহিদুল ইসলামকে কলাতলীর একটি হোটেলে বেঁধে রাখে। ওই সময় তাকে ব্যাপক মারধর করে। পরে তাঁর ভাই এসে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।
তিনি বলেন, ইয়াবা নিয়ে বেঈমানি করার কারণেই মূলত শহিদুল ইসলামের সাথে মোনাফের দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া ঢাকায়ও বেশ কয়েকবার গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল শহিদুল ইসলাম। অবশ্য মোটা অংকের টাকা দিয়ে প্রতিবারই তাৎক্ষনিকভাবে ছাড়িয়ে নেয়া হয় তাকে।
জানা গেছে, শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাকের ইয়াবা পাচারের এখন নতুন রুট হচ্ছে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়ন ও রামুর গর্জনিয়া ইউনিয়ন হয়ে বাইশারী-ঈদগড়-ঈদগাও সড়ক। এই রুটে চেকপোষ্ট না থাকায় নিরাপদে পাচার হচ্ছে লাখ লাখ পিচ ইয়াবা। আর এই রুটের সবকিছু দেখাশুনা করেন শহিদুল ইসলাম। সম্প্রতি তাদের সিন্ডিকেটের এক পাচারকারি বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিয়ে বাইশারী ফাঁড়ির পুলিশের হাতে আটক হয়। ওই সময় বেশ কয়েক জন ব্যক্তির নাম স্বীকার করে ওই পাচারকারি। বর্তমানে ওই সড়কে অপরিচিতা নারীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে বলে জানান বাইশারী ও ঈদগড় এলাকার বেশ কয়েকজন গাড়ি চালক। অপরিচিতা ওই নারীরা মোস্তাক সিন্ডিকেটের পাচারকারি বলে জানিয়েছে অনেকে।
সূত্রমতে, মোস্তাক সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বেশি ইয়াবা পাচার হয় সাগর পথে। ইয়াবা বহনের জন্য মোস্তাকের মালিকাধীন বেশ কয়েকটি ফিশিং ট্রলার রয়েছে। ওই ট্রলার গুলো দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা বহন করে ইনানীর রেজু খালের মোহনায় নিয়ে আসে। পরে সেখানে খালাস হয় ইয়াবার চালান। সেখান থেকে ইয়াবা গুলো সংগ্রহ করে ঘুমধুম-গর্জনিয়া-বাইশারী-ঈদগড়-ঈদগাও সড়ক দিয়ে পাচার করা হয়।
এছাড়াও মাদার চিংড়ি আহরণের জাহাজ দিয়েও পাচার হয় মোস্তাক সিন্ডিকেটের ইয়াবা। এই রকম একটি জাহাজে মোস্তাকের অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছে তাঁর একটি ঘনিষ্ট সূত্র।
একটি সূত্র জানিয়েছে, এক সময় খুচরা বিক্রেতা হলেও বর্তমানে বিশাল ইয়াবা গোডাউন গড়ে উঠেছে মোস্তাকের। এখন লাখ লাখ পিচ ইয়াবা পাচার করে এই মোস্তাক। ইয়াবার টাকায় মোস্তাক গোয়ালিয়া পালং এলাকায় ৭ নং ও ৮ নং ওয়ার্ডে ২০ কোটি টাকার জমি কিনেছেন। নিজের কুড়ে ঘরটিকে আলিশান বিল্ডিংয়ে পরিণত করেছেন। অথচ কয়েক বছর আগেও ঠিকমত তিন বেলা ভাত জুটতো না তাদের কপালে। এছাড়াও তিনটি স’মিল রয়েছে তাঁর। অর্ধশতাধিক সিএনজি ও নোয়া রয়েছে। কক্সবাজারের প্রায় ব্যাংকেই অ্যাকাউন্ট রয়েছে মোস্তাকের। সেখানে কোটি কোটি টাকা রয়েছে। অ্যাকাউন্ট চেক করলে টাকার পরিমাণ বেরিয়ে আসবে।
জানা গেছে, বছর খানেক আগে উখিয়া সার্কেল এএসপি জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশ ১০ হাজার ইয়াবাসহ বাড়ি থেকে মোস্তাককে আটক করে। ওই সময় তার অনুগত সদস্যরা পুলিশের উপর হামলা করে। পরে ওই ঘটনায় রামু থানায় তার বিরুদ্ধে মাদক ও পুলিশ অ্যাসাল্ট মামলা দায়ের করা হয়। সেই সময় কয়েক মাস টানা কারাভোগ করে মোস্তাক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি তালিকায়ও মোস্তাকের নাম শীর্ষে রয়েছে।
সূত্রমতে, ইয়াবা নিয়ে আটক হওয়া সেলিম ছাড়াও শুরু থেকেই তাকে সেল্টার দিয়ে আসছে কক্সবাজারের এক সাংবাদিক। ওই সাংবাদিকের জন্য অনেক কিছু করেছেন মোস্তাক। যা এখন লোকেমুখে। বছর খানেক আগে মোস্তাক এক সঙ্গে ৫০টি সিএনজি ক্রয় করে। সেখান থেকে ১০ টি সিএনজি ওই সাংবাদিককে একেবারেই দিয়ে দেন মোস্তাক।
জানা গেছে, কথিত ওই সাংবাদিকের মাধ্যমেই পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তার আর্শিবাদপুষ্ট হন ইয়াবা ব্যবসায়ী মোস্তাক। ওই পুলিশ কর্মকর্তা সদর থানার ওসি সহ কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি থানায় ওসি হিসাবে কর্মরত আছেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তার সকল অসাধু কর্মকান্ড দেখশুনা করেন কথিত ওই সাংবাদিক। সস্প্রতি মোস্তাকের সাথে কথিত ওই সাংবাদিকের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। তাই গ্রেফতার আতঙ্কে কিছুদিন আন্ডার গ্রাউন্ডে ছিলেন মোস্তাক। তবে বর্তমানে মোস্তাককে প্রশ্রয় দিচ্ছেন শীর্ষ দুই জনপ্রতিনিধি। তাদের প্রশ্রয়েই মূলত এখন বেপরোয়াভাবে ইয়াবা পাচার করছে মোস্তাক।
সূত্রমতে, জনগণের মন জয় করার নানা কৌশল রপ্ত করেছে মোস্তাক। অবশ্য টাকার কেরামতিতেই সব সম্ভব হয়েছে। গ্রামের প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের যুবক-যুবতীর বিয়ের দায়িত্ব দেন তিনি। তাদের বিয়েতে যত টাকা খরচ হয় সবই বহন করেন তিনি। একারণে তার প্রতি সাধারণ মানুষের দরদ বেশি। আর সেটি কাজে লাগিয়েই তিনি এখন খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার।
এবিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। যদি পরবর্তীতে বক্তব্য পেলে গুরুত্ব সহকারে ছাপানো হবে।
তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।