চট্টগ্রামে ৫ হাজার ৬শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন

ডেস্ক নিউজ#

চট্টগ্রাম মহানগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে ৫ হাজার ৬শ’ ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে পাস হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রায় ষাট বছরের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বড় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ অচিরেই শুরু হবে। এই প্রকল্পের আওতায় খাল খনন ও সম্প্রসারণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা হবে। এতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে। প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়েছে, আশি লাখ মানুষের চট্টগ্রাম শহরে পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশন হয় ৫৭টি খাল দিয়ে। কিন্তু অবৈধ দখল, ভরাট আর বর্জ্যে বোঝাই এসব খাল বৃষ্টি হলেই আর পানি সরাতে পারে না। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর এই জলাবদ্ধতা এবং নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও যানজট দূর করতে শহরের জলাবদ্ধতা কমানো জরুরি। এছাড়া পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বন্দর নগরীর অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় শহরের ভেতর ও বাইরের (চাক্তাই খাল, রাজাখাল, মহেশখাল, মীর্জা খালসহ) ৩৬টি খাল পুনঃখনন করা হবে। এসব খালের ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি খনন ও ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার কাদা অপসারণ, ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার সাইড ড্রেন নির্মাণ, প্রায় ১০৭ একর জমি অধিগ্রহণ, ৪ হাজার ৫১৫ বর্গমিটার স্থাপনার ক্ষতিপূরণ, ১৭৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার ৯ম পৃষ্ঠার ১ম কলাম
নতুন রাস্তা নির্মাণ, ৪৮টি পিসি গার্ডার ব্রিজ প্রতিস্থাপন, ৬টি কালভার্ট প্রতিস্থাপন, ৫টি টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন, ৪২টি সিল্ট ট্র্যাম্প স্থাপন, বন্যার পানি সংরক্ষণে ৩টি জলাধার স্থাপন, বিদ্যমান ৩০২ কিলোমিটার ড্রেনের সংস্কার ও মেরামত, ২ হাজার বৈদ্যুতিক পোল স্থানান্তর, ৮৮০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জুলাই, ২০১৭ থেকে জুন, ২০২০ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি সমন্বিত ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। তবে এ কাজে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসণকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা থাকবে না বলেও গত বছর প্রণীত মাস্টার প্ল্যানে অভিমত দেয়া হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের তৈরি করা ওই মাস্টার প্ল্যানের আওতায় প্রকল্পটি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর শেরে বাংলানগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক সভা একনেক চেয়ারপার্সন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে চট্টগ্রামের এ প্রকল্পটি সহ বেশ কয়েকটি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। শুরুতে চট্টগ্রামের প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘ আলোচনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবদুচ ছালাম প্রকল্পটির গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। পরে সভায় ৫ হাজার ৬শ’ ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পটি সিডিএ বাস্তবায়ন করলেও পুরো অর্থই সরকারি কোষাগার থেকে যোগান দেয়া হবে।
মেগা এই প্রকল্পটির আওতায় চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে ওয়াসার উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ১৯৯৫ সালের মাস্টার প্ল্যান আপগ্রেড করা হয়। বিশ্বব্যাংক, গ্রন্টমিজ, এ্যাকোয়া, আইডবিহ্মউএম যৌথভাবে সার্ভে করে মাস্টার প্ল্যান আপগ্রেড করে। ১৯৯৫ সালে প্রণীত মাস্টার প্ল্যান ২২ বছরে বাস্তবায়িত না হলেও আপগ্রেডেড মাস্টারপ্ল্যান মাত্র এক বছরের মাথায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সিডিএ।
প্রকল্প সূত্র জানা যায়, সর্বমোট ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১০৭ দশমিক ৭ একর জমি অধিগ্রহণে ১ হাজার ৭২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণে ৩১৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
৩৬টি খালের মাটি অপসারণে ২৮ কোটি ৮৫ লাখ ও মাটি খননে ২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ১৭৬ কিলোমিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য ২ হাজার ৬৪০ কোটি, ৪৮টি পিসি গার্ডার ব্রিজ প্রতিস্থাপনে ২৯৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
বন্যার পানি সংরক্ষণে ৩টি জলাধার স্থাপনে ৪৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ৬টি আরসিসি কালভার্ট প্রতিস্থাপনে ৭ কোটি ২০ লাখ, ৫টি টাইডাল রেগুলেটর ৮৪ কোটি ৭৫ লাখ, ১২টি পাম্পস স্থাপনে ৩২ কোটি ৬ লাখ, ৪২টি সিল্ট স্ট্র্যাম্প স্থাপনে ২৯ কোটি ৪০ লাখ, ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার নতুন সাইড ড্রেন নির্মাণে ১৭ কোটি ২২ লাখ, ২০০টি ক্রস ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
৩০২ কিলোমিটার স্থিত রোড সাইট ড্রেন পরিষ্কার ও মেরামতের জন্য ৬০ কোটি ৪০ লাখ, ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার স্থিত রোড সাইড ড্রেনের সম্প্রসারণে ৪ কোটি ৩৪ লাখ, ২০০০টি বৈদ্যুতিক পুল স্থানান্তরে ২ কোটি, ৮৮০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপনে ৪ কোটি এবং ৯২টি ইউটিলিটি স্থানান্তরে ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি খাত রয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেছেন, নগরীর ৩৬টি খালের অবস্থাই নাজুক। এসব খাল দখল হয়েছে। ভরাট হয়েছে। সিডিএ ইতোমধ্যে খালের ব্যাপারে আর এস জরিপ অনুযায়ী সার্ভে শুরু করেছে। খালগুলো উদ্ধার করে পুনঃখনন, সংস্কার এবং মাটি তোলা হবে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবদুচ ছালাম গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিকতায় পুরো চট্টগ্রামবাসী কৃতজ্ঞ। প্রকল্পটি পুরো চট্টগ্রামবাসীর। সকলের সাথে বসে সমন্বয় করে প্রকল্পটির কাজ শেষ করবো ইনশা আল্লাহ।’ তিনি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ অচিরেই শুরু করা হবে বলে উল্লেখ করে তিনি চট্টগ্রামবাসীর সহায়তা ও দোয়া কামনা করেছেন।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।