২৪ অক্টোবর, ২০১৭ | ৯ কার্তিক, ১৪২৪ | ৩ সফর, ১৪৩৯


রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে পারব: প্রধানমন্ত্রী

বিবিএন#

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্যাতন-হত্যা-ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সহায়তা মানবিক করণেই অব্যাহত রাখা হবে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনও তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ সংকট নিরসনে এখন বিশ্বব্যাপী নানা আলোচনা চলছে। মিয়ানমার আলোচনা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক চাপ ও আলোচনার মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে এর সমাধান করতে পারব।শনিবার সকালে জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফেরার পর ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ৫ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতা প্রদর্শনের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতায় এই সংকটের প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করায় শেখ হাসিনাকে এই সংবর্ধনা দেয়া হয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার শুরুটা ১৯৭৮ সাল থেকেই। এবার প্রথম যখন তারা আসতে শুরু করলো-আমরা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম, কী করবো। লাখ লাখ মানুষ চলে আসছে! পরে আমি খোঁজ নিলাম। জানলাম-সেখানে গণহত্যা চালানো হচ্ছে। আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করলো রেহানা। সে বললো, তুমি ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারছো; আর ৫-৭ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবে না?তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছুটে গেলাম নির্যাতনের শিকার হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মানুষ গুলোর মাঝে। আমরা তখনও জানতাম না কী করবো-কী খাওয়াবো! এখন অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে এসেছে আমরা তাদের ধন্যবাদ জানায়। বিপন্ন মানুষ গুলোকে আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রয়োজনে আমরা এক বেলা খাবো; আরেক বেলা আমাদের খাবার তাদের দেবো। আজ বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিতো; পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো।মিয়ানমারকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো যেনো কখন যুদ্ধ বেধে যায়। আসলে তারা চাইছিলো; উত্তেজনা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক বিশ্বের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতে। তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী,বর্ডারগার্ড, নৌবাহিনীসহ সকল সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করলাম। আমাদের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াটা জরুরী ছিলো। আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলাম। আপনাদের সমর্থন আগেই ছিলো; এখন আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থনও আমাদের সঙ্গে রয়েছে।রোহিঙ্গাদের থাকার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে রাখা হবে। প্রথমে নাম নিয়ে বিভ্রান্তি ছিলো। নোয়াখালীরা বলে ঠেঙার চর-চট্টগ্রামের মানুষ বলে ভাসান চর। রোহিঙ্গারা যেহেতু ভাসমান মানুষ ওই জায়গার নাম ভাসানচরই থাক। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখানে আসছে। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত আমরা তাদের সাহায্য করে যাবো।

সংকট শুরু হওয়ার পরপরই মিয়ানমারের আকাশ সীমা লঙ্ঘন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে ওই সময় মিয়ানমার নানা ভাবে উসকানি দিয়েছে। মিয়ানমারের উসকানিতে যাতে পা দেওয়া না হয়, এ জন্য সেনাবাহিনীকে সতর্ক করেছি।

অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটা সময় ছিলো অনেকেই বিশ্বাস করতে পারতো না বাংলাদেশ পদ্মাসেতু করতে পারবে। এমন খরস্রোতা নদীতে বিশ্বের খুব কম জায়গায়ই সেতু আছে। সেটাও সর্বোচ্চ তিনটির মতো। তার ওপর বিশ্বব্যাংকও চলে গিয়েছিলো। আমি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু করতে চাইলাম। আমরা ক্যাবিনেটেরও অনেকে বলেছিলো; এটি সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা তা করে দেখিয়েছি। পিলারের উপর স্প্যান বসানোয় সেতুর দৃশ্যমান অগ্রগতি এখন সকলের সামনে দৃশ্যমান।

পরপর দু’বার ক্ষমতায় থাকার কারণেই এটা করা সম্ভব হয়েছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, পরপর দু’বার ক্ষমতায় থাকার কারণে উন্নয়ন গুলো এখন দৃশ্যমান। স্বাধীনতার পর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, সকলেই লুণ্ঠন এবং নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যস্ত ছিলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ সব সময় মানুষের রাজনীতি করে। দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করে। পদ্মা সেতু সে সাক্ষর রাখে।

পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ একটা সময় তাকেও ভুগিয়েছে জানিয়ে বলেন, এটা সময় ছিলো কোথাও যেতে পারতাম না। আমার আর রেহেনার দিকে এমন ভাবে তাকানো হতো যেনো; আমরা কোনো বড় অপরাধ করেছি। আমি তখন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম দুর্নীতি করে থাকলে প্রমাণ করুন। তা তারা কখনও করতে পারেনি। বিশ্ব ব্যংকে একজন পর্যবেক্ষক ছিলেন: তিনি এক একটা অফিসে যেতেন আর আমাকে এবং রেহেনাকে ইঙ্গিত করে বলে বেড়াতেন বড় দুর্নীতিবাজ! এখন শোনা যাচ্ছে চল্লিশ হাজার পৃষ্ঠার দুর্নীতি আমল নামা বের হচ্ছে। ওই সময়টা ছিলো আন্তর্জাতিক ভাবেও আমাদের জন্য দুঃসময়।

তিনি বলেন, নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করতে পেরে দুর্নীতির কথা বলে যে অপমান করা হয়েছে, তার জবাব দিতে পেরেছি। বিশ্বব্যাংক আগে অপপ্রচার করেছে, কিন্তু তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এখন তাঁদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের তদন্ত দলের প্রধান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি বেরোচ্ছে। সত্যের জয় তাৎক্ষণিক হয় না। মিথ্যার জয় তাৎক্ষণিক। একপর্যায়ে গিয়ে সত্যের জয় হয়। আমাদের জয় হয়েছে। বাংলাদেশকে হেয় করতে চেয়েছিল। পারেনি। দুর্নীতির কথা বলে ওই সময় বিশ্বব্যাংকের তদন্তের নামে মানসিক অত্যাচার করেছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল দুর্নীতি হয়নি।

জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যুক্তরাজ্যে তিন সপ্তাহের সফর শেষে শনিবার সকালে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী গণভবনের উদ্দেশ্য রওয়ানা হন। এই যাত্রাপথে রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে সর্বস্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ ফুল ও বাদ্যযন্ত্র, রঙবেরঙের ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টার এবং জাতীয় পতাকা হাতে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বলে অভিহিত করেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তাই তিনি দুনিয়ায় বিপন্ন মানবতার বাতিঘরে পরিণত হয়েছেন। তাই এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।