২৪ অক্টোবর, ২০১৭ | ৯ কার্তিক, ১৪২৪ | ৩ সফর, ১৪৩৯


বন্ধ হচ্ছে শিশুর ঘাড়ে ব্যাগের বোঝা

ডেস্ক রিপোর্ট : আদালতের আদেশ, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থী অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রতিবাদ উদ্বেগের পর অবশেষে শিশু শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে বইয়ের বোঝা কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সরকারী অনুমোদনহীন যে কোন বই ও শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর বিষয়ে সতর্ক করে আদেশ জারি করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। আদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিশুদের জন্য যেসব বই অনুমোদন করেছে তা পরিবহনে কোন ছেলে-মেয়েদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যেসব ছাত্রছাত্রী ব্যাগে বই বহন করে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী এর ওজন যাতে বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের বেশি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক হওয়া বাঞ্ছনীয়। এদিকে সকলকে সতর্ক করে আদেশ দিলেও কঠোর কোন নিষেধাজ্ঞা না দেয়ায় সরকারের নতুন উদ্যোগে কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সন্দিহান শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। যারা শিশুদের ওপর অনুমোদনহীন বই চাপায় সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে শিশুরা কোনভাবেই এ সঙ্কট থেকে রক্ষা পাবে না বলে আশঙ্কা অভিভাবকরদের। তবে সরকারের নতুন আদেশের ফলে সংশ্লিষ্টরা কিছুটা হলেও শতর্ক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ আবু হেনা মোস্তাফা কামালের স্বাক্ষরিত পরিপত্রে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ব্যাগে অনুমোদিত বই-উপকরণ ছাড়া অন্য কিছু বিদ্যালয়ে আনতে নিরুৎসাহিত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, আট বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষার বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জেলা, উপজেলা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রাইমারী টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেনডেন্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিশুদের জন্য যেসব বই অনুমোদন করেছে তা পরিবহনে কোন ছেলে-মেয়ের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ভারি ব্যাগ বহনের কারণে যাতে পিঠে ব্যথা বা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো সমস্যা দেখা না দেয় সেজন্য অনুমোদিত বই, উপকরণ ছাড়া অন্য কিছু ব্যাগে করে বিদ্যালয়ের বয়ে আনা নিরুৎসাহিত করতে হবে। ব্যাগের ওজন শিশুদের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি যাতে না হয় পরিপত্রে তা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরিচালনা পর্যদ এবং অভিভাবকদের বলা হয়েছে।

শিশুদের ঘাড়ে অসংখ্য বইয়ের বোঝা নিয়ে নানামুখী সমালোচনা হচ্ছে বহুদিন ধরে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো বইয়ের বোঝা সামলাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যুবরণের মতো ঘটনা না ঘটলেও যুগের পর যুগ শিশু ও তার মা-বাবার উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে বিদ্যালয় থেকে চাপিয়ে দেয়া অসংখ্য বই ও শিক্ষা উপকরণ। যার অধিকাংশই সরকার অনুমোদিত না হলেও শিশুদের পড়তে বাধ্য করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর এসব বই পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির বিনিময়ে শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নোট-গাইড বইয়ের প্রকাশকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।

নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজধানীর বিয়াম স্কুল এ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী লাবণ্য। মঙ্গলবার স্কুলে যাওয়ার সময় তার ব্যাগে ছিল ৮টি বই। সঙ্গে আরও ৮টি খাতা। পেনসিল বক্স, টিফিন বক্স ও পানির ফ্লাস্ক, নির্দিষ্ট একটি পত্রিকায় ছাপা মডেল টেস্টসহ একটি ফাইলও সঙ্গে বহন করতে হয়েছে এ শিশুকে। স্কুলের কাছাকাছি এসে শিশুটি তা মাকে বলছে ‘আম্মু আর পারছি না। এবার তুমি ব্যাগটি ধর’। শিশুটির অভিভাবক লায়লা জাহান অভিযোগ করলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী স্কুল থেকে খাতা কিনতে হয়। দেখা যায়, একই বিষয়ে দু-তিনটি খাতাও নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু হোমওয়ার্ক আর অন্যগুলো ক্লাসের জন্য।’

শুধু এ অভিভাবক নয়। রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে শুরু করে নামী-দামী কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এ সঙ্কটের বইয়ে নেই। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, কেজি স্কুল, ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলে সঙ্কট আরও ভয়াবহ। অভিভাবকরা প্রতিবাদ করলেও তারা বলছে, তাদের প্রতিষ্ঠান সরকারের সুযোগ-সুবিধা নেয় না, তাই সরকারের নিয়ম এখানে প্রযোজ্য নয়। দিন এভাবে প্রাথমিক স্তরের লাখ লাখ শিশু বহন করছে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা। বইয়ের বোঝা কমাতে শিক্ষাবিদসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা মত দিয়েছেন সবসময়। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই শিশুদের ঘাড় থেকে বাড়তি বইয়ের বোঝা কমানোর বিষয়ে শতর্ক করেছেছ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর।

প্রাথমিকে শিশুর শরীরের ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ করতে ছয় মাসের মধ্যে আইন প্রণয়নে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। সেইসঙ্গে ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন না করতে এবং বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমের সকল স্কুলে ৩০ দিনের মধ্যে একটি সার্কুলার জারি করতেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ওই নির্দেশনার পাঁচ মাস পর গত মে মাসেও শিশুদের ভারি ব্যাগ নিয়ে চলা ঠেকাতে কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অসন্তোষ ছিল জনমনে।

চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ৫ বছরের একটি ছেলে শিশুর আদর্শ ওজন ১৮ দশমিক ৭ কেজি, আর মেয়ের ১৭ দশমিক ৭ কেজি। ৬ বছরের একটি ছেলে শিশুর আদর্শ ওজন ২০ দশমিক ৬৯ কেজি, আর মেয়ের ১৯ দশমিক ৯৫ কেজি। সে হিসাবে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর ব্যাগের ওজন সর্বোচ্চ ২ কেজি হওয়ার কথা (শরীরের ওজনের ১০ শতাংশ)। সেখানে ঢাকার খ্যাতনামা স্কুলগুলোর প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ওজন সর্বনিম্ন চার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ কেজি পর্যন্ত পাওয়া যায়। অন্য শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও হিসাবটা এরকমই। অথচ প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত বই মাত্র এক থেকে তিনটি।

অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগের কারণে শিশুরা মেরুদ- ও হাড়ের বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে বেড়ে উঠছে বলে চিকিৎসকরাও শতর্ক করেছেন বিভিন্ন সময়। সমাধান হিসেবে বই কমিয়ে আনা অথবা বিভিন্ন দেশের মতো বই-খাতা স্কুলে রেখে আসার ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। এ অবস্থায় মঙ্গলবার পরিপত্র জারি করে অধিদফতর। সরকার অনুমোদিত বই ও উপকরণের বাইরে কোন কিছু না আনতে সতর্ক করে পরিপত্র জারি করা হলেও এতে সরকারের দেয়া পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অনুমোদিত উপকরণ কোনগুলো সে বিষয়েও কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। দেয়া হয়নি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন নিষেধাজ্ঞাও।

এতে তাই সুফল নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা। অভিভাবকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভিভাবক সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিপা সুলতানা বলছিলেন, সরকার প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে সতর্ক করে আদেশ দিয়েছে এটা অবশ্যই ভাল খবর। তবে যারা বই চাপিয়ে দিচ্ছে আমাদের বাচ্চাদের ওপর সেই কর্তৃপক্ষের মনে যদি ভয় ঢোকানো না হয় তাহলে ভাল ফল পাওয়া যাবে না। কারণ শিশুরা অনুমোদনহীন বই না এনে পারবে না যদি তা পাঠ্যক্রমে কর্তৃপক্ষ রেখেই দেন। তাই এমন আদেশ হতে হবে যাতে কেউ এসব বই পাঠ্যক্রমেই রাখতে না পারে।

ঢাকায় অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের আহ্বায়ক জিয়াউল কবির দুলু বলছেন, শিক্ষা উপকরণ বলতে কি বোঝানো হয়েছে পরিপত্রে তা স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে এটি লোক দেখানো বলেই মনে হচ্ছে। বইয়ের কারণে তো ব্যাগের ওজন বাড়ে না। বইয়ের সঙ্গে প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য একটি করে খাতা বহন করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন ধরনের ডায়েরি। এসব বহন করা বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের পরিপত্র জারি না করে হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে আইন করে শিশুদের ব্যাগ যাতে ভারি না হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে বলেও মত দেন দুলু।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ আবু হেনা মোস্তাফা কামাল মিটিংয়ে থাকায় তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অধিদফতরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও শীঘ্রই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে। তবে এখনই বলা যাচ্ছে না তা কবে হবে। এ কর্মকর্তা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আইনের খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনও কোন অগ্রগতি নেই।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিশুদের বাঁচাতে হলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে, বইয়ের বোঝা কমাতে হবে। সেটা কীভাবে হবে তা খুঁজে বের করতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া দরকার। এছাড়াও বিষয়টি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা হওয়ার কথা আনন্দময়। কিন্তু বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে তাদের শারীরিক ক্ষতির মুখে ফেলে শৈশবকে নিরানন্দ করা হচ্ছে। আশা করছি সরকার এ বিষয়ে আরও কাজ করবে। এজন্য মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের জোরালে মনিটরিং করারও পরামর্শ দেন তিনি।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ ইকরামূল কবীর বলছিলেন, যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা আরও কঠোরভাবে করলে ভাল হতো। জনকণ্ঠ

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।