১৬ জুন, ২০১৯ | ২ আষাঢ়, ১৪২৬ | ১২ শাওয়াল, ১৪৪০


বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের শেকঁড় “হালখাতা”

এম আবুহেনা সাগর,ঈদগাঁও:পয়লা বৈশাখ, নতুন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বাঙালির নতুন জীবন। উৎসব প্রিয় বাঙালির প্রাণের উৎসব হালখাতা। অতীতে হালখাতাই ছিল বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব। এদিনটি ব্যবসায়ীদের কাছে আনন্দের দিনও বটে। হালখাতা শুধু হিসাবের নতুন খাতা খোলা নয়,পাওনা আদায়ের পাশাপাশি ক্রেতাদের আপ্যায়নের মাধ্যম। হালখাতার এই ঐতিহ্য সুদীর্ঘ কাল বহন করে চলছে বাঙালির আনন্দ উৎসব আর সম্প্রীতির গৌরবগাঁথা।নববর্ষের হালখাতায় ব্যবসায়ীরা তাদের হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নুতন খাতা খুলেন। এই উপলক্ষে তাঁরা নুতন-পুরাতন খদ্দের ও শুভাকাংখীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত পহেলা বৈশাখে হালখাতার এই অনুষ্ঠানটির মাধ্যমেই বাঙালির সম্পর্ক অটুট রাখার প্রয়াস।ব্যবসায়ীরা নববর্ষে হালখাতার আয়োজন করে আজও। বাংলা সনের প্রথমদিন দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার এই প্রক্রিয়া পালন করা হয়। ব্যবসায়িরা এদিন তাদের দেনা পাওনার হিসাব সমন্বয় করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য ক্রেতাদের আগের বছরের সকল পাওনা পরিশোধ করার কথা বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন তাদের মিষ্টিমুখ করান ব্যবসায়িরা। আগে একটিমাত্র মোটা খাতায় ব্যবসায়িরা তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিন নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হালনাগাদ করার এ রীতি থেকেই উদ্ভব হয় হাল খাতার। একসময় বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিলো হালখাতা। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বছরের শেষদিন ধুঁয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নানা জাতের ফুল, বেলুন, রঙিন কাগজ আর ‘শুভ নববর্ষ’, ‘শুভ হালখাতা’ লেখা ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো দোকান। নতুন বছরের জন্য কেনা হত নতুন খাতা, ক্যালকুলেটর,কলমসহ কত কি। আর নববর্ষের প্রথম দিনে দোকান খুললেই পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতাদোকানের অবয়বে আনা হয় নতুনত্ব।সেই সাথে রঙ বেরংয়ের বাহারী কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়। কেউবা মুখে মুখেই দাওয়াত দিয়ে দেন। কার্ড দেয়া নেয়াটা তাদের কাছে মূখ্য বিষয় হয়ে উঠেনা। বিষয়টা সম্পর্কের। হোক ব্যবসায়িক নতুবা আত্মিক। মোবাইলে কল দিয়ে,মেসেজের মাধ্যমে,অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক,মেসেঞ্জার,ইমোতে এসব দাওয়াতনামা পাঠান। নিয়মিত গ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক ও শুভানুধ্যায়ীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা। হালখাতায় আগত অতিথি দের মিষ্টি মুখ করান। শুধু যে মিষ্টি মুখ তা কিন্তু না সাথে থাকে নানা রকম খাবারের ব্যবস্থা যেমন,কালোজাম,সন্দেশ,বাতাসা,জিলাপি,লুচি, লাচ্ছা সেমাই, সুজি,হালুয়া,দই,চিড়া,শরবত, বৈশাখী ফলমূল আর খাওয়া শেষে মিষ্টি পান।গ্রামের হালখাতা আর শহরের হালখাতার মধ্যে একটু ভিন্নতা দেখা যায়। গ্রামের হালখাতাতে ব্যবসায়ীরা বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে এসে দোকান পরিষ্কার করে কাগজের ফুল দিয়ে সাজান বর্ণিল সাজে। শহরের ব্যবসায়ীরা হাল খাতার দিনে নানা রঙের আলোকসজ্জায় দোকান সাজিয়ে থাকেন। ঈদগাঁও বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী এড.অশোক আচায্যের ঝাঁকজমকপূূর্ন পরিবেশে প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও তাঁর দোকানে হালখাতা উৎসব পালন করবে বলে জানিয়েছেন। বেশ কবছর পূর্বেও ব্যাপক পরিবেশে হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন চোখে পড়তো। সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা এখন অনেকটাই কমে গেছে। হালখাতা বলতে আগে যেমনটি বোঝাতো এখন আর তা নেই। নিয়ম রক্ষার জন্য অনেকেই হালখাতা করেন। পুরোনো খাতার বদলে লাল রঙের নতুন খাতা কেনেন। তবে হালখাতার হাল আগের মতো না থাকলেও চিরায়ত এ অনুষ্ঠানটি কিন্তু হারিয়ে যায়নি এখনও। ‘হালখাতা’ বাংলা নববর্ষের অন্যতম উপাদান। হালখাতার এই আতিথিয়তায় এক অন্যরকম তৃপ্তি,অন্য রকম স্বাদ,বাঙালির ঐতিহ্যের শেকঁড়ের প্রতীক হাল খাতা। বাঙালি জীবনে হালখাতা উৎসব হোক সমৃদ্ধময়। সমস্ত হিংসা-বিদ্বেষ ঝেঁড়ে ফেলে সত্য এবং সুন্দর স্বপ্নরা হোক চিরজীবী।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।