২৫ মে, ২০১৯ | ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ | ১৯ রমযান, ১৪৪০


না ফেরার দেশে সুবীর নন্দী

না ফেরার দেশে চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী। বাংলাদেশ সময় আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন তিনি মারা যান। সুবীর নন্দীর মেয়ে ফাল্গুনী নন্দী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর নেয়ার দুই দিন পর সুবীর নন্দীর শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলেও এরপর অবনতি হতে থাকে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা চলাকালীন পরপর তিনবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও একবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল।উন্নত চিকিৎসার জন্য সাত দিন আগে সিঙ্গাপুর নেয়া হয় একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীকে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের এমআইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন ছিলেন বরেণ্য এই সংগীতশিল্পী।বাংলাদেশে সুবীর নন্দীর চিকিৎসার বিষয়টি সমন্বয় করছিলেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জাতীয় সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন।গতকাল সকালে গণমাধ্যমকে সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘বারবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় চিকিৎসকেরা যে আশা করেছিলেন, তা-ও ক্ষীণ হয়ে গেছে। সুবীরের মাল্টিপল অরগান ফেইলিউর হয়েছে। এখনকার অবস্থা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।’১৮ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ এপ্রিল সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় সুবীর নন্দীকে। সেদিন বিকেলেই সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে বরেণ্য এই শিল্পীর চিকিৎসা শুরু হয়।সুবীর নন্দী ১২ এপ্রিল পরিবারের সবাইকে নিয়ে মৌলভীবাজারে আত্মীয়ের বাড়িতে যান। সেখানে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৪ এপ্রিল ঢাকায় ফেরার ট্রেনে ওঠার জন্য বিকেলে মৌলভীবাজার থেকে পরিবারসহ শ্রীমঙ্গলে আসেন। পরে তিনি ট্রেনে অসুস্থ হয়ে পড়লে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে সুবীর নন্দীকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে যান।ওই দিনই রাত ১১টার দিকে তাঁকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। সেখানে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন।

প্রাথমিক জীবন
সুবীর নন্দী হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানায় নন্দী পাড়া নামক মহল্লায় এক কায়স্থ সম্ভ্রান্ত সঙ্গীত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।।তার নানা বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাদেআলিশা গ্রামে. তার পিতা- সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সঙ্গীতপ্রেমী। তার মা পুতুল রানী চমৎকার গান গাইতেন কিন্তু রেডিও বা পেশদারিত্বে আসেন নি।ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে সঙ্গীতে তার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত বাগানেই ছিলেন।চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি স্কুল ছিল, সেখানেই পড়াশোনা করেন। তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময়ই তার কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। হবিগঞ্জ শহরে তাদের একটি বাড়ি ছিল, সেখানে ছিলেন। পড়েছেন হবিগঞ্জ গভঃ হাইস্কুলে। তারপর হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুবীর নন্দী সেকেন্ড ইয়ারে পড়তেন।

কর্মজীবন
বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী দীর্ঘ ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রেও উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান।১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণী থেকেই তিনি গান করতেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ। সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং এর মধ্য দিয়ে। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’ -এর গীত রচনা করেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম।৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম “সুবীর নন্দীর গান” ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন।

চলচ্চিত্রের তালিকা
*সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬)*অশিক্ষিত (১৯৭৮)*দিন যায় কথা থাকে (১৯৭৯)*মহানায়ক (১৯৮৪)*চন্দ্রনাথ (১৯৮৪)
*শুভদা (১৯৮৬)*পরিণীতা (১৯৮৬)*রাজলক্ষী শ্রীকান্ত (১৯৮৭)*রাঙা ভাবী (১৯৮৯)*পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১)
*স্নেহ (১৯৯৪)*বিক্ষোভ (১৯৯৪)*মায়ের অধিকার (১৯৯৬)*আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭)*শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯)
*চন্দ্রকথা (২০০৩)*মেঘের পরে মেঘ (২০০৪)*শ্যামল ছায়া (২০০৪)*হাজার বছর ধরে (২০০৫)*শত্রু শত্রু খেলা (২০০৭)*চন্দ্রগ্রহণ (২০১৮)*আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা (২০০৮)*অবুঝ বউ (২০১০) *দুই পুরুষ (২০১১)*মাটির পিঞ্জিরা (২০১৩)

#পুরস্কার ও সম্মাননা
*শিল্পকলায় একুশে পদক (২০১৯)

#জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
*১৯৮৪: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – মহানায়ক *১৯৮৬: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শুভদ*১৯৯৯: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শ্রাবণ মেঘের দিন*২০০৪: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – মেঘের পরে মেঘ *২০১৫: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – মহুয়া সুন্দরী

#বাচসাস পুরস্কার
*১৯৭৭: সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পী*১৯৮৫: সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শুভরাত্রি *১৯৮৬: সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শুভদা

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।