২১ জুলাই, ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ, ১৪২৬ | ১৭ জিলক্বদ, ১৪৪০


নতুন করে ভেঁঙ্গে যাচ্ছে বেড়ীবাঁধ, বর্ষার আতংকে মাতারবাড়ীবাসী

মহেশখালীতে একের পর এক মেঘা উন্নয়ন প্রকল্পে পাল্টে যাচ্ছে উপজেলার চিত্র । বিশেষ করে উপজেলার মাতারবাড়ীতে ১৪’শ ও ১২’শ একর জায়গার উপর নির্মিত হচ্ছে ২৬শ মেঘাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে । ইতিমধ্যে মাতারবাড়ীর দক্ষিণে ১৪’শ ১৪ একর জায়গায় ১৪শ মেঘাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ প্রায় ৫০% সমাপ্ত হয়েছে । আর মাতারবাড়ীর পশ্চিমে নৌ-বন্দর নির্মাণও চলছে জরিপ কাজ । সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী হতে যাচ্ছে মিনি সিঙ্গাপুর । তার পরেও মাতারবাড়ী সাগর পাড়ের মানুষের আর্তনাদে যেন আকাশ বাতাশ ভারি হয়ে উঠছে । মাতারবাড়ীর প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে নিরব কান্নার রোল । মাতারবাড়ীতে এত উন্নয়ন তার পরও সুখে নেই এ ইউনিয়নের মানুষ গুলো,বর্ষা শুরু হলেই পানির সাথে যুন্ধ করে চলতে হয় তাদেরকে । সাগরের জোয়ারের পানি অার বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে তলিয়ে গেছে মাতারবাড়ীর দক্ষিণ রাজঘাট,বিল পাড়া,উত্তর সিকদার পাড়া,দক্ষিণ সাইরার ডেইল সহ অনেক নিম্নাঞ্চল । এদিকে মাতারবাড়ী ইউনিয়নটি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও দূর্যোগের তোপের মূখে থাকে প্রতিনিয়ত । বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে মাতারবাড়ীর মানুষ গুলো সব চাইতে বেশি ক্ষতি গ্রস্ত হয়ে থাকে ।

স্থায়ীভাবে ব্ল-ক দিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার না করার কারণে বার বার ক্ষতির সম্মুখীন হয় উপকূলের এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন । ক্ষতিগ্রস্ত মাতারবাড়ীবাসীর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও স্লুইচগেট নির্মাণের দাবী দীর্ঘ দিনের হলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে কাজের কোন প্রকার অগ্রগতি হয়নি এখনো । ফলে অতীতেও উপকূলের লাখো মানুষ অকালেই প্রাণ হারায় সর্বনাশা বঙ্গোপসাগারে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আর সাগরের বিশাল জলরাশিতে । মাতারবাড়ী পশ্চিমের বেঁড়িবাধের পাশে বসবাসকারী লোকজন জানান, গেল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু ও ফণি’র প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছসে ব্যাপক ক্ষতি হয়ে ছিল মাতারবাড়ীতে তা এখনো পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারে নি অনেক অসহায় পরিবার । ঘুমানোর জন্য ছিলনা কোনো নিরাপদ বাসস্থান । কিন্তু তার পরেও এ নিয়ে খুব বেশি আক্ষেপ নেই তাঁদের । সবার আগে স্থায়ী বেড়িবাঁধ চান তারা। অপরদিকে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের পশ্চিমে ষাইটপাড়া এলাকায় বেড়িবাঁধের আধাঁ কিলোমিটার এলাকা নতুন করে সাগরে বিলীন হতে চলেছে । পাকা বেড়িবাঁধের বড় অংশ ধসে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে মাতারবাড়ীর ৯০ হাজার বসবাসকারী মানুষের। বেড়িবাঁধের বাকি এক কিলোমিটার অংশও যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। তেমনটা হলে পুরো ইউনিয়ন সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে।

ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন স্থানীয় লোকজন। মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাষ্টার মোহাম্মদ উল্লাহ বার-বার পানি নিস্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দাবী জানালেও কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী এতে কোন কর্ণপাত না করে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানালেন ভুক্তভোগীরা । এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাষ্টার মোহাম্মদ উল্লাহ’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন , গত দুই দিন আগে মাননীয় ইউএনও মহোদয় এসে ভাঙ্গা বেড়ীবাঁধ সহ বিভিন্ন এলাকা দেখে গেছেন । তিনি এ ব্যাপারে আমাকে একটা প্রতিবেদন তৈরি করে জমা দিতে বলেছেন । তিনি আরো বলেন , অামি বার বার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে আবেদন করার পরও তারা কোন ধরনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে না । মাঝে মাঝে জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করলেও তা টেকসই না হওয়ায় সাগরের ঢেউয়ে বিলিন হয়ে যায় । পানি নিষ্কাশনের জন্য গত বছর যে দুইটি পাইপ বসানো হয়েছে তা দিয়ে সম্পুর্ন পানি বের করা সম্ভব নয় । কিন্তু কোল-পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানীর কাছে বার বার বলা সত্ত্বেও তারা একটি স্লুইচগেটের ব্যবস্থা না করায় এ দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে মাতারবাড়ীতে । মাতারবাড়ী রক্ষা করতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করলেও এখনো কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। মাতারবাড়ীতে বাস্তবায়নাধীন বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের কোন দাবীই এখনো পুরন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়াও কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী মাতারবাড়ী ইউনিয়নে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে পুরো ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে এমন অভিযোগও রয়েছে। এরই মধ্যে দুইটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণের ফলে পানি চলাচলের জন্য নির্মিত সমস্ত স্লুইচগেইট বন্ধ হয়ে গেছে । এটিই এখন মাতারবাড়ীর মানুষের আতংকের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।

যার ফলে স্থানীয় লোকজন ধীরে-ধীরে ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে। এ বিষয়টি অবহিত করতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, কোলপাওয়ার জেনারেশন ও মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে আবেদন করেছেন মাতারবাড়ীর চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ। তিনি বলেন অবিলম্বে মাতারবাড়ীতে পানি নিস্কাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সকলেই এ সব কাজ বাস্তবায়ন করার জন্য বলেছেন। তারপরও কেন হচ্ছে না তা মাতারবাড়ীর মানুষ জানতে চায় । ইতোমধ্যে উত্তর রাজঘাট ও পশ্চিম পাশের বেড়ীবাধের ভয়াবহ অবস্থা। জোয়ারের পানি প্রবেশ করার সুযোগ থাকলেও তা আর বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই । এতে দ্বীর্ঘ স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে বলে জানান স্থানীয়রা । যার ফলে জমি হারানো লোকজন আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

মাতারবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ভিত্তিক ২টি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে জাপানের জাইকা এবং সিংগাপুরের অর্থায়নে। ইতোপূর্বে মাতারবাড়ীর ৯০ হাজার মানুষ সময়ে অসময়ে তাদের ন্যায্য কিছু দাবী নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে বহুবার উপস্থাপন করার পরও নুন্যতম দাবীও এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। প্রকল্প কার্যক্রম শুরু করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্টক হোল্ডারের সভায় পুনর্বাসনের নামে ২১ ক্যাটাগরির ক্ষতিপুরণের আশ্বাস দিলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। স্থানীয়রা বলেন, কর্মহারা শ্রমিকদের পুণর্বাসনে এবং চাকুরীর অগ্রাধীকার দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও , তা বাস্তবে নেই । প্রকল্পের ভিতরে যে সব কাজ মাতারবাড়ীর মানুষ পারবে এতেও বাহিরের লোক এনে কাজ করানো হচ্ছে । প্রথম প্রকল্পের জন্য নিয়োগকৃত এনজিও সুশিলন কর্তৃক জরিপভুক্ত ১২০০ শ্রমিককে পুণর্বাসন করার জন্য প্রকাশ্যে ইউপি ভবণে, প্রতিটি বাজারে ও নোটিশ বোর্ডে তালিকা প্রকাশ করেন। আবার প্রকাশিত তালিকা থেকে ১ একরে একজন শ্রমিক রেখে বাকি শ্রমিক বাদ দেওয়ার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র করায় শ্রমিক শ্রেণী মর্মাহত । প্রকল্প থেকে উচ্ছেদ হওয়া ৪৫ পরিবারের পুণর্বাসন নিয়ে হচ্ছে নানা তালবাহানা। জমির ক্ষতিপুরণ প্রদানের ক্ষেত্রে রয়েছে মূল্য বৈষম্য। গত বর্ষার পানিতে মাতারবাড়ীর নিচু এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল ।

লবণ পানি প্রবেশের সুযোগ না থাকায় দুই প্রকল্পের বাইরে হাজার-হাজার একর লবণ মাঠ গেল মৌসুমে চাষ করতে পারেনি লবন চাষিরা । একই ভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে চলতি বর্ষায়ও হবে না ধান চাষ । জরুরী মুহুর্তে ব্যবস্থা না নিলে চলতি বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে বড় ধরণের বন্যার মত দ্বীর্ঘ দিন সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে , এমন মন্তব্য স্থানীয়দের । বিকল্প পথে পানি চলাচলের ব্যবস্থার জন্য কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কোল-পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারকে বার-বার অবহিত করার পরও কোন ব্যবস্থাই গ্রহন করে নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান । তাছাড়া ৭০ নং পোল্ডারের পশ্চিম ষাইটপাড়া বেড়ীঁবাধটি খুবই ঝুঁকিপুর্ণ। কোন নিরাপত্তা না থাকায় অনেকেই এখন এলাকা থেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপর আস্তা রেখে মাতারবাড়ীর মানুষ নির্বিঘ্নে জমি দিয়েছে । কিন্তু প্রকল্পে কিছু অসাধু কর্মকর্তার অতি লোভ লালসার কারনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া কোন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না করায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্দ হয়েছেন ।

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এস এম আবু হায়দার বলেন , মাতারবাড়ীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এবং সাইট পাড়া বেড়ীবাঁধ ভাঙ্গন ব্যাপারে আমাদের মাননীয় এমপি আলহাজ্ব আশেক উল্লাহ রফিক কে অবহিত করা হয়েছে । মাতারবাড়ীর মানুষ যাতে দুর্ভোগে না পড়ে সে জন্য তিনি শিঘ্রই টেকসই বেড়ীবাঁধ নির্মাণ সহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করবেন বলে জানান । এদিকে গত দুই দিন অাগে মাতারবাড়ীর পশ্চিমের সাইট পাড়া সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গেছেন মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জামিরুল ইসলাম। এ ব্যাপারে তিনি মাতারবাড়ীর চেয়ারম্যান কে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন । এবং তিনি মাতারবাড়ীর ভাঙ্গা বেড়ীবাঁধটির ব্যাপারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কে অবহিত করা হবে বলে জানান । মাতারবাড়ীর সৃষ্ট জলাবদ্ধতার ব্যাপারেও বিহিত ব্যবস্থা নিবেন বলেও জানান তিনি ।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।