২১ অক্টোবর, ২০১৯ | ৫ কার্তিক, ১৪২৬ | ২১ সফর, ১৪৪১


বিবিএন শিরোনাম

কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপে সোনালি সম্ভাবনা

সাগরের বুকে ভাসমান হাঁসের আকৃতির এই কুতুবদিয়া দ্বীপ। উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ তিন দিকে বঙ্গোপসাগর ঘেরা। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে দূরত্ব ৭৫ কি.মি.। পূর্বে কুতুবদিয়া চ্যানেল পাড়ি দিয়ে মহেশখালী, পেকুয়া, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি এ দ্বীপ। বহির্নোঙরে সারি সারি জাহাজ আলো ছড়ায়।

দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামকে বঙ্গোপসাগরের সরাসরি আঘাত থেকে সুরক্ষায় ঢাল কিংবা বর্মের মতো আগলে রেখেছে কুতুবদিয়া। ছোট্ট ভূখন্ড হলেও এর অবস্থান ভৌগোলিক গুরুত্ব অনেক বেশি।

সাগর পাড়ের মানুষ ধনবান। গরীব থাকতে হয়না। সমুদ্রের মাছ, লবণ ইত্যাদি আহরণ হলেই আসে তাদের আয়-রোজগার। ধীরে ধীরে বলছিলেন আ স ম শাহরিয়ার চৌধুরী। এক নম্বর উত্তর ধুরং ইউপি চেয়ারম্যান।

একটু দম নিয়ে ফের বলেন, তবে কুতুবদিয়া দ্বীপে সমুদ্রের ভাঙন এবং ভ‚মিক্ষয় ভয়াবহ। এ কারণে গরীব আরও গরীব হচ্ছে। দশ বছর ধরে আমার ইউনিয়নে বঙ্গোপসাগরের নিয়মিত জোয়ার-ভাটায় পানি ঢেউ খেলছে। বাঁধের নামে কোটি কোটি টাকার বাজেট হয়। টাকা আসে ব্যয়ও হয়। কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়না।

প্রায় সারাদিন ঘুরেফিরে নানান শ্রেণি-পেশার মানুষের কথাবার্তায় জানলাম, কুতুবদিয়ায় মূল সমস্যা সমুদ্রের ভাঙন। দ্বীপবাসীর দাবি স্থায়ী বেড়িবাঁধ। চাই জানমাল ও দ্বীপ সুরক্ষা।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি সবার একই কথা। দ্বীপের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে হা করে আছে উত্তাল সমুদ্র। দ্বীপের ভাঙা দরজা খোলা। বেড়িবাঁধের চিহ্ন মুছে গেছে। অনেক জায়গায় দেখি লোনা পানির আসা-যাওয়া। ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে জিও ব্যাগ।

৬ নম্বর আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নে ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধের ভেতরে-বাইরে বস্তির সারি। একই দৃশ্য উত্তর ধুরং, দক্ষিণ ধুরং, বড়ঘোপে। রেজাউল, মানিক, কাসেম, লেদু জানালেন ভাঙনে ভিটেবাড়ি হারিয়ে ভাঙা বাঁধের কিনারে কোনমতে ঠাঁই নিয়েছি। সাগরে মাছ ধরে সংসার চলে। এখানেও যদি ভাঙে কোথায় যাব?

তাদের আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশী অনেকেই পৈত্রিক ঠিকানা হারিয়ে চকরিয়া, কক্সবাজার শহর, রামু, লামা, আলীকদম, মহেশখালী, চট্টগ্রামসহ অন্যত্র চলে গেছেন।

কুতুবদিয়ার কৃতিসন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন জানান, হাজার বছর পূর্বে শিলা-পাথরের ওপর এ দ্বীপের গঠন। দ্বীপটি বিলীন হবেনা। বরং সাঙ্গু, মাতামুহুরী নদীর বয়ে আনা পলিমাটি ধীরে ধীরে জমছে। দ্বীপঘেঁষে ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে।

সেখানে ভাটার সময় ছেলেরা খেলাধূলা ও জেলেরা জাল পরিষ্কার করে। দ্বীপের আয়তন বাড়বে। হয়তো সময় লাগবে। তবে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিবিড়ভাবে বৃক্ষ রোপনসহ এরজন্য বিভিন্ন সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করাও প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক, খনিজ, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ, লবণ, শুটকি, কৃষি-খামার মিলিয়ে কুতুবদিয়া ধনে-ধান্যে ভরা। এ দ্বীপের অপার সোনালি সম্ভাবনা। অনেক কিছুই এখনো অনাহরিত ও অনুদঘাটিত। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মিত না হওয়ায় সম্ভাবনার দুয়ার আটকে আছে। কুতুবদিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের এই চাওয়া আজো সোনার হরিণ। বিশেষজ্ঞরা জানান, এ দ্বীপটি প্রায় ৭শ’ বছরের প্রাচীন জনপদ।

ষোড়শ শতাব্দীতে হযরত কুতুবুদ্দিন (রহ.) নামে একজন আউলিয়া কামেলের সঙ্গী-সাথীরা মগ-পর্তুগীজ দস্যুদের বিতাড়িত করেই দ্বীপকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলেন। তার নামানুসারে কুতুবুদ্দিনের ‘ডিয়া’ বা দ্বীপ। চারপাশে উঁচু ও মজবুত বেড়িবাঁধ না থাকায় গত ৫০ বছরে সমুদ্রের ভাঙনে ২৫ বর্গ কিলোমিটার জমি বিলীন হয়ে এখন ৬৫ বর্গ কি.মি. ঠেকেছে।

একশ বছর আগে আয়তন ছিল ১৫০ বর্গ কি.মি.। ১৮৪৬ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক কুতুবদিয়া বাতিঘর দুই কি.মি. পিছিয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে খুদিয়ার টেক, রাজাখালী মৌজার অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। একশ’ কি.মি. বেড়িবাঁধ এখন ৪০ কি.মি.। তাও ভাঙাচোরা।

১৯৬১-৬২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আজম খান কুতুবদিয়া পরিদর্শন করেন। তখন ৬০ কিলোমিটার মজবুত বেড়িবাঁধ এবং ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উঁচু আজম সড়ক নির্মাণ করেন। যা কুতুবদিয়ার প্রধান অবকাঠামো। আজো মানুষের মুখে আজম খানের অবদানের কথা। দ্বীপে আজম কলোনী তার স্মৃতি বহন করছে।

বিনিয়োগে যাচাই হচ্ছে

কুতুবদিয়ার কৌশলগত সুবিধাজনক ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে চায় সরকার। এই লক্ষ্যে সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, রফতানিমুখী শিল্প, অর্থনৈতিক জোন ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।

সরকারি-বেসরকারি দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (বিজিটিসিএল) এবং অন্যান্য কোম্পানি কুতুবদিয়ায় ৩ থেকে ৭টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও স্টেশন করতে চায়।

অর্থনৈতিক জোন কর্তৃপক্ষ (বেজা) সেখানে অর্থনৈতিক এলাকা গড়ে তুলতে আগ্রহী। জ্বালানি বিভাগ এ দ্বীপে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্টেশন ও সাব-মেরিন পাইপলাইন স্থাপন করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় জ্বালানি তেল সরাসরি সরবরাহের দিক যাচাই করছে।

দেশের বৃহত্তম কর্পোরেট শিল্প-বাণিজ্য গ্রুপ বেক্সিমকো জ্বালানি ও খনিজ খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে টেকনো-ইকোনোমিক স্টাডি শুরু করেছে। বেক্সিমকো কুতুবদিয়ায় প্রায় ৭শ’ থেকে ৯শ’ একর জমি চায়। সেখানে এসব খাতে বড়সড় বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী।

বেক্সিমকো কোম্পানির উদ্যোগে কুতুবদিয়া দ্বীপের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব পাশে সমুদ্রতট ও সমুদ্রের তলদেশে পলি-বালি পাতন (সিলটেশন) প্রবণতার ওপর কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তাছাড়া ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপ, পেট্রোনেট, আবদুল মোনেম গ্রুপ, পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনসহ (বিপিসি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহী।

তবে কুতুবদিয়ায় বিনিয়োগ, প্রকল্প স্থাপন, এরজন্য ভ‚মি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি-প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এখন পর্যন্ত অবগত নয় এমনটি জানান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) নুরুল আলম নিজামী, কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউল হক মীর ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুপ্রভাত চাকমা।

১৯৯২ সাল থেকে তিন মেয়াদে ১৬ বছর নির্বাচিত উত্তর ধুরং ইউপির চেয়ারম্যান আ স ম শাহরিয়ার চৌধুরী জানান, বিনিয়োগে আগ্রহী একাধিক প্র্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ ও জানাশোনার চেষ্টা করেছে। বেক্সিমকো গ্রুপের উদ্যোগ সম্পর্কেও জেনেছেন।

প্রত্যয়ের সুরেই বললেন, বর্তমান কুতুবদিয়া লবণচাষী, মৎস্যজীবী, কৃষিজীবীদের কুতুবদিয়া। দশ বছর পরের কুতুবদিয়া হবে শিল্পায়ন ও জ্বালানি সম্পদের কুতুবদিয়া। এ দ্বীপে জায়গা কম। অথচ ঘনবসতি। শিল্পায়ন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হলে অনেক বাসিন্দা স্থানান্তরিত হবে। এলাকাবাসী কোথায় যাবেন, কীভাবে কর্মসংস্থান হবে এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের এখনই গবেষণা করা উচিৎ।

এদিকে বেড়িবাঁধের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করে কুতুবদিয়ায় বিদ্যুতায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ফেরি সার্ভিস, রাস্তাঘাট সংস্কারের দাবি এলাকায় জোরালো। কুতুবদিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি এস কে লিটন কুতুবীর প্রশ্ন, সমুদ্রের ভাঙনে দ্বীপের অস্তিত্ব নিয়েই টানাটানি। সেখানে বিনিয়োগকারীরা আসবেন কিভাবে? ১৯৯১ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে এ পর্যন্ত দ্বীপের দক্ষিণ পাশে ১০ কি.মি., উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ৩ কি.মি. বেড়িবাঁধ সাগরে হারিয়ে গেছে।

বড়ঘোপ ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক মো. হাবিবউল্লাহ বলেন, ভাঙন সমস্যা প্রকট। সমুদ্রের লোনা পানিতে প্লাবিত হচ্ছে ফসলি জমি, বসতঘর, রাস্তাাঘাট। ফেরি সার্ভিস না থাকায় বিচ্ছিন্ন এ দ্বীপের সঙ্গে বিশেষত দুর্যোগের মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় যুবলীগ কর্মী শেখ মোহাম্মদ রাসেল অভিজ্ঞ ঠিকাদার নিয়োগ করেই স্থায়ীভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণের তাগিদ দিয়ে বলেন, এখন জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন ডুবছে এমন জায়গাগুলো জিও ব্যাগ দিয়ে রক্ষা করতে হবে।

দেশের সবচেয়ে বড় এবং পরীক্ষামূলক বায়ু-বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সৈকতের দক্ষিণ দিকে আলী আকবর ডেইলে অবস্থিত। বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় মাত্র এক মেগাওয়াট। ৪ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায় সীমিত কিছু গ্রাহক। এছাড়া দ্বীপে জেনারেটর, সোলার বিদ্যুতেই ভরসা। ৭৫ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের আলোর বাইরে থাকেন।

প্র্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ করে জানা গেল, সাব-মেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করে এক বছরের মধ্যেই কুতুবদিয়াবাসী বিদ্যুৎ পাবেন। একইভাবে ইতোমধ্যে স›দ্বীপে বিদ্যুৎ দেয়া হয়। শিগগিরই ফেরি যোগাযোগে সুখবরের অপেক্ষায় আছেন দ্বীপবাসী। এ ব্যাপারে সক্রিয় বিবেচনা করছে সরকার।

ঝুলে আছে আংশিক বেড়িবাঁধও

কুতুবদিয়ায় আংশিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পটিও দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার কথা স্বীকার করেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

পাউবো কুতুবদিয়ার দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান এ বিষয়ে বলেন, ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের অক্টোবরে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড সাব-ঠিকাদারকে দিয়ে ৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু করে। কিন্তু ঠিকাদারের মৃত্যু ও হাতবদলের কারণে তারা কাজ করতে পারেনি। দুই বছরে মাত্র ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টির মৌসুম শেষে নভেম্বরে ফের কাজ শুরু হবে। কুতুবদিয়া বেড়িবাঁধ পাউবো’র ৭১ নম্বর পোল্ডারের অন্তর্ভুক্ত।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুপ্রভাত চাকমা জানান, কুতুবদিয়ায় বেড়িবাঁধের জোড়াতালি মেরামত ছাড়া স্থায়ী সমাধান খোঁজা হয়নি কখনও। বাঁধ না থাকায় আবাদি জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। ধান, শাক-সবজির ফলন কমে গেছে। জমিতে একবার লবণ চাষ হলেই পরের বছর কোন ফসল, শাক-সবজি ফলে না। কৃষক আবদুল মালেক বলেন, দ্বীপের উত্তরাংশ ও বিভিন্ন স্থানে নলক‚পে মিঠাপানির স্তর পেতে অনেক গভীরে খনন করতে হয়। খরচ পড়ে লাখ টাকা।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :