২৩ আগস্ট, ২০১৯ | ৮ ভাদ্র, ১৪২৬ | ২১ জিলহজ্জ, ১৪৪০


কক্সবাজারে সাগরপাড়ে ‘খিরার’ বাম্পার ফলন

বিশেষ প্রতিনিধি:
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পাড়ে বাম্পার ফলন হয়েছে দেশীয় শসার (খিরা)। স্থানীয় বাজার গুলোতে চাহিদা থাকায় দামও মিলছে ভাল। এতে হাসি ফুটেছে দরিদ্র চাষিদের মুখে। চাষিরা এখন স্বপ্ন দেখছেন খিরা ও অন্যান্য সবজি চাষ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর।
জানা গেছে, সমুদ্র সৈকতের পাড় ঘেঁষে শহরের বিমান বাহিনীর কার্যালয় থেকে কবিতা চত্বর পর্যন্ত প্রায় ১’শ এককেরও বেশি জমিতে শীত মৌসুমে খিরারসহ অন্যান্য সবজির চাষ হয়। বালুকাময় উর্বর এই জমি খিরা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
চলতি শীত মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সময়মতো বীজ রোপণ করায় বিগত বছরের তুলনায় এবার খিরার বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজার দর বেশি হওয়ায় খুশি চাষিরা। তাছাড়া কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় খিরা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষিরা। তবে অভিযোগ উঠেছে, কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের কোন ধরণের সহযোগিতা বা পরামর্শ দেওয়া হয় না।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শিশু একাডেমি সংলগ্ন বিমান বাহিনীর সীমানা প্রাচীরের ভেতর বিশাল এলাকা, সমিতিপাড়া সড়কের পশ্চিমপাশে, বিয়াম ফাউন্ডেশনের পূর্ব-দক্ষিণ পাশ ও কবিতা চত্বর এলাকায় মাঠের পর মাঠ খিরা ক্ষেতে ছেয়ে আছে। কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন খিরা উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাত করণ ও পাইকারি বিক্রয়ে।
কৃষকেরা জানান, অক্টোবরের শুরুর দিকে খিরা চাষ শুরু হয়। মাত্র ৪৫ দিনে ক্ষেত থেকে খিরা উত্তোলন করা যায়। অর্থ্যাৎ নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে খিরা বিক্রি শুরু করে তারা। আগামি আরও একমাস খিরা উৎপাদন অব্যাহত থাকবে।
বিমান বাহিনীর সীমানা প্রাচীরের ভেতর খিরা চাষ করেছেন সুলতান আহমেদ (৫০)। তাঁর বাড়ি শহরের সমিতিপাড়া বন্দরপাড়া এলাকায়। বিমানবাহিনীর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করছেন। গত ১০ বছর ধরে তিনি সমুদ্র পাড়ে খিরা ও অন্যান্য সবজি চাষের সঙ্গে জড়িত। চলতি মৌসুমে এক কানি জমিতে তিনি খিরা চাষ করেছেন। এতে তাঁর জমি ভাড়াসহ সবমিলিয়ে খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা। তাকে চাষাবাদে সহযোগিতা করেন তাঁর স্ত্রী হাছিনা বেগম। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে কৃষক সুলতান আহমেদ বেশ ভাল লাভের মুখ দেখছে এখন।
তিনি বলেন, গত দেড় মাস ধরে তিনি খিরা বিক্রি করছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন তিনি। আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার খিরা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি।
তিনি আরও বলেন, তাঁর পাঁচ সন্তান রয়েছে। এরমধ্যে তিনজনই স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়ে। খিরা চাষের লাভের তাঁর পরিবারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরবে বলে জানান।
মুজিবুর রহমান (৩৩) নামে এক কৃষক জানান, এবার দেড় কানি জমিতে তিনি খিরা চাষ করেছেন। এতে তাঁর খরচ পড়েছে ৪৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তিনি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন। আরও ৩০ হাজার বিক্রি করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা তাঁর।
তিনি বলেন, গেল বছর উৎপাদন মৌসুমে পরিবেশ প্রতিকূলে থাকায় ৪০ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হয় তাকে। তবে এবছর তিনি ইতোমধ্যেই বেশ লাভের মুখ দেখেছেন।
মুজিবুর রহমান বলেন, খিরা ছাড়াও তিনি মিষ্টি কুমড়া, টমেটো ও ভুট্টাও চাষ করেছেন। তবে এখনও এসব সবজির উৎপাদন শুরু হয়নি। সেখান থেকেও বেশ লাভ করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা তাঁর।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন ৫০০ কেজি খিরা উৎপাদন হয় সাগরপাড়ের এসব জমি থেকে। বর্তমানে প্রতিমন খিরার বাজার দর ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা। পুরো মৌসুমে অন্যান্য সবজি ছাড়া শুধুমাত্র খিরা উৎপাদন হয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার। বর্তমানে সাগরপাড়ে উৎপাদিত খিরা স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে রামু, ঈদগাঁও ও উখিয়াতে অভ্যন্তরীণ রপ্তানী হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রতিদিন শহরের বড়বাজার, বাহারছড়া বাজার, খুরুশকুল, ঈদগাঁও, রামু ও উখিয়া এলাকা থেকে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষেত থেকে খিরা সংগ্রহ করেন। পরে পাইকারি দরে বিক্রি করেন তারা।
গতকাল বুধবার ক্ষেতে খিরা সংগ্রহ করতে যান বড়বাজারের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন (৩৮)। তিনি ৩০ মন খিরা সংগ্রহ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ক্ষেত থেকে ক্রয়ের সময় প্রতিকেজির দাম পড়ে ২৫ টাকা। আর তারা পাইকারি হিসেবে ২৮ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করেন।
শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে শীতকালিন ফল হিসেবে খিরার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও তাজা হওয়ায় বাজার করার সময় পছন্দের তালিকায় থাকে খিরা। খুচরা বাজারে এখন এটি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা করে।
শহরের টেকপাড়া এলাকার আবু ছালেক নামে এক ব্যক্তি বলেন, সাগরপাড়ে উৎপাদিত খিরা তাজা অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া এখানকার কৃষকেরা মানবদেহের ক্ষতিকর কোন ধরণের বিষ ব্যবহার করে না বলে তিনি শুনেছেন। এছাড়াও হাইব্রিড শসার চেয়ে সাগরপাড়ে উৎপাদিত খিরা বেশ সুস্বাদ।
সাগরপাড়ের প্রায় ১’শ একর জমিতে খিরা চাষের সাথে দুই শতাধিক চাষি জড়িত। যারা শুধুমাত্র শীত মৌসুমে চাষ করেন। এরমধ্যে অর্ধশতাধিক নারী চাষিও রয়েছে। যাদের কেউ স্বামী পরিত্যক্ত, কেউ বিধবা বা কেউ অসহায়। এসব নারীরা নিজেদের শ্রমে খিরা চাষ করে পরিবারের হাল ধরছেন। আবার কেউ কেউ চাষাবাদে স্বামীকে সহযোগিতা করে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ভুমিকা রাখছেন।
রাশেদা বেগম (৪৪) নামে এক নারী চাষির সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, তাঁর পাঁচ সন্তান রয়েছে। গত আট বছর ধরে তিনি সাগরপাড় এলাকায় চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত। প্রতি মৌসুমে যা আয় হয়, তা দিয়ে সারাবছর কোন রকম দিনকাটে রাশেদা বেগমের।
কৃষিতে নানা ধরণের উন্নত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ থাকলেও সাগরপাড়ের খিরা ও অন্যান্য সবজি চাষে এসবের কিছুই পায়না চাষিরা। চাষিদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগ থেকে তাদের কোন ধরণের সহযোগিতা করা হয় না। কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেলে চাষাবাদে আরও বেশি উন্নতি করতে পারবে বলে দাবী করেন তারা।
সাগরপাড়ের খিরা চাষ অনেক দরিদ্র পরিবারে কিছুটা হলেও স্বচ্ছলতা ফিরে দিচ্ছে। যদিও মৌসুম ছাড়া বাকি সময়ে পেশা পাল্টাতে হয় এসব চাষিদের। তারপরও বছরের অন্যান্য সময় গুলো কষ্টে কাটলেও খিরা উৎপাদন মৌসুমে বেশ ভাল কাটে তাদের। তবে সাগরপাড়ের এসব কৃষি জমি সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও দপ্তরের প্রয়োজনে ব্যবহার হওয়ায় দিনদিন সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। তাই সাগরপাড় থেকে ঐতিহ্যবাহি খিরা চাষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলেও অনেক কৃষকের আশঙ্কা।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :