১৯ আগস্ট, ২০১৯ | ৪ ভাদ্র, ১৪২৬ | ১৭ জিলহজ্জ, ১৪৪০


চকরিয়ায় বন্যার পদধ্বনি: পানিবন্দি দেড় লাখ মানুষ

কক্সবাজারের চকরিয়ায় টানা এক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ ইউনিয়নই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া পৌর এলাকার বেশিরভাগ নিন্মাঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো থেমে থেমে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিকাল পর্যন্ত বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি নিন্মাঞ্চল ডিঙ্গিয়ে এখন বাড়িঘরে প্রবেশ করায় উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে বেশিরভাগ ইউনিয়নের আমন বীজতলাসহ শতশত একর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঢলের পানি প্রবেশ করায় বন্যাকবলিত বেশিরভাগ ইউনিয়নের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অঘোষিত বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে বিভিন্ন ইউনিয়নের সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় উপজেলা সদরের ওইসব ইউনিয়নের সকল ধরনের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গত শুক্রবার থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ার কারনে পাহাড় ধ্বসসহ যে কোন মানবিক বিপর্যয় ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশংকা থাকায় পাহাড়ের চূড়ায়, পাহাড়ের পাদদেশ ও পাহাড়ের আশেপাশে বসবাসকারীদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে। ফলে এসব লোকজন প্রশাসনের নির্দেশনা মতো দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ায় পাহাড় ধ্বসসহ যে কোন মানবিক বিপর্যয় ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি থেকে লোকজন রক্ষা পেয়েছে।

এদিকে ভারী বর্ষনের দিন থেকে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যে কোন দূর্যোগ মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুদ্দীন মোহাম্মদ শিবলী নোমান।

উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ভারী বর্ষণের ফলে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁর ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে হাজার হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে জিদ্দাবাজার-কাকারা-সুরাজপুর-মানিকপুর সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানোর পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম আরও বলেন, মাতামুহুরী নদীতে এখনো ঢলের পানি বাড়তে থাকায় মাঝের ফাঁড়ি ব্রীজ সংলগ্ন একটি মসজিদ ও মানিকপুর রাখাইন পাড়া এলাকার দুইটি মন্দির নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।

কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত ওসমান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে প্রবল বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁর ইউনিয়নের অন্তত ২০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় ৪ হাজার পরিবারের বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করায় এসব পরিবারের রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গিয়ে খাবার নিয়ে তারা চরম দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় তার ইউনিয়নের পানিবন্দি লোকজন চরম দূর্ভোগে পড়েছে। বিষয়টি স্থানীয় সাংসদ আলহাজ্ব জাফর আলম ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতলব বলেন, এক সপ্তাহ ধরে প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে অন্তত ১০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ৫শতাধিক পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গিয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল আহামদ সিকদার বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোবিন্দপুর, ডেইংগাকাটাসহ ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টি ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ওই ইউনিয়নের অন্তত ২০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে বানিয়ারছড়া-শান্তিরবাজার-কুতুববাজার সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কোন কোন জায়গায় নৌকা নিয়েই লোকজন যাতায়ত করছে। পানিতে ডুবে থাকায় এ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অঘোষিত বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।

লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কাইছার বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে টানা বর্ষনের ফলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তার ইউনিয়নে পূর্বপাড়া, জহিরপাড়া, হাজীপাড়া, মন্ডলপাড়া ও চরপাড়া এলাকার অন্তত ১০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ৫শতাধিক পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে। বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে চকরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আমজাদিয়া ফাজিল মাদ্রাসাসহ বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অঘোষিত বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনিয়নের জিদ্দাবাজার-ছিকলঘাটা সড়কসহ বেশ কয়েকটি সড়ক পানিতে তলিয়ে গিয়ে সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

কৈয়ারবিল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মক্কি ইকবাল হোসাইন বলেন, তার ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলাম নগর এলাকার কিছু অংশ ছাড়া ইউনিয়নের সকল ওয়ার্ডই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া খোজাখালী, জলদাসপাড়া ও ভরাইন্যারচরসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের প্রায় ৩ হাজার পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব পরিবার রান্নাবান্নার অভাবে চরম কষ্টে রয়েছে। বন্যার পানিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গিয়ে অঘোষিত বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া ছিকলঘাট-কৈয়াবিল সড়কসহ ইউনিয়নের প্রায় আভ্যন্তরীণ বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

হারবাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম বলেন, তার ইউনিয়নে বন্যার পানিতে অন্তত ১৫ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাটাখালী, রাখাইন পাড়া, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহাজন পাড়া, কালা সিকদারপাড়া, নয়াপাড়া,বাইঘ্যাপাড়া, ৪ নম্র ওয়ার্ডের সিকদার পাড়া, কোরাল পাড়া, গোদার পাড়া, ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর পহরচান্দা ও দক্ষিণ পহরচান্দা এলাকায় প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে।

উপজেলার উপকুলীয় বদরখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খাইরুল বশর ও কোনাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার বলেন, টানা বর্ষনের ফলে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল তাদের ইউনিয়নের বিভিন্ন শাখা খাল ও স্লুইচ গেইট দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে ইউনিয়ন দু’টির অধিকাংশ নিন্মঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া বর্তমানেও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় উপকুলের মৎস্য প্রকল্পসমুহ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে তাঁর ইউনিয়নের বেশিরভাগ নীচু এলাকা হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কয়েক হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে উপজেলার চিংড়িজোনের হাজার হাজার মৎস্য প্রকল্প পানিতে তলিয়ে গিয়ে ঘের মালিক ও চাষীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া খুটাখালী, ডুলাহাজারা, ফাঁসিয়াখালী ও সাহারবিলসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আমন বীজতলাসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশংকা দেখা দিয়েছে।

চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, টানা বর্ষনের ফলে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পৌরসভার একাধিক স্থানে বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মাতামুহুরী নদীর ঢল ও জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের অন্তত ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মোহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ভারী বর্ষনের ফলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এ কন্ট্রোল রুম থেকে বন্যাপরিস্থিতি সার্বিক মনিটরিং করা হচ্ছে। ইউএনও আরও বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ইউনিয়ন গুলোতে আগামীকাল শুক্রবার ৩০ মে:টন চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের কাছে প্রেরণের জন্য স্ব-স্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :