২৩ আগস্ট, ২০১৯ | ৮ ভাদ্র, ১৪২৬ | ২১ জিলহজ্জ, ১৪৪০


আদালতে চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যাকাণ্ডের জবানবন্দি

‘জামাল হাত ধরে রাখে, আমি গলাটিপে মেরে ফেলি’

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে অপহরণ করে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও ভোমরিয়া ঘোনা খালের পাড়ে গলাটিপে হত্যা করা হয় শিশু আকাশকে। ছবি- সংগৃহিত

আজিম নিহাদ:

‘মুঠোফোনের মাধ্যমে আকাশের মায়ের কাছে একাধিকবার মুক্তিপণ দাবী করা হয়। কিন্তু রাজি হননি। মুক্তিপণ না পেয়ে খালাতো ভাই জামালের সহযোগিতায় আকাশকে হত্যা করি। জামাল আকাশের দু’হাত ধরে রাখে, আর আমি তাকে গলাটিপে হত্যা করি। এরপর খালের পাড়ে লাশটি ফেলে দেই।’

চট্টগ্রাম জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে চাঞ্চল্যকর একটি শিশু হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানন্দি দেন হত্যাকারী ওমর ফারুক। ওই জবানবন্দিতে তিনি এসব তথ্য উল্লেখ করেন। জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. হেলাল উদ্দিন আসামীর এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

জবানবন্দিতে ওমর ফারুক আরও উল্লেখ করেন, শিশু আকাশকে মেরে ফেলার পর তার মায়ের কাছে পূণরায় তিনি মুঠোফোনে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবী করেন। অন্যথায় ছেলেকে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেন।

শেষ পর্যন্ত মুঠোফোনে বিকাশের মাধ্যমে শিশু আকাশের মা তাঁকে (ওমর ফারুক) পাঁচ হাজার টাকা মুক্তিপণ দেন। কিন্তু এরও অনেক আগে শিশু আকাশকে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা।

জানা গেছে, গত ১২ জানুয়ারী শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বার আউলিয়া এলাকার মো. আলমগীর হোসেনের ছেলে মো. আকাশকে (১২) ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে অপহরণ করে কক্সবাজার নিয়ে আসেন ওমর ফারুক (২৪) নামে এক যুবক।

তাঁর বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নে। পরে ১৩ জানুয়ারী শিশু আকাশের মা রুবি আক্তারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবী করেন অপহরণকারি ওমর ফারুক। ওই সময় রুবি আক্তার অপহরণকারিকে মুক্তিপণ দিতে সামর্থ্য হননি।

এরপরও কয়েক দফা মুক্তিপণ দাবী করা হয়। কিন্তু দরিদ্র মা টাকা দিতে না পারায় ১৪ জানুয়ারী শিশু আকাশকে নির্মমভাবে হত্যা করে অপহরণকারি ওমর ফারুক। আকাশকে হত্যার পর টানা দুইদিন বিভিন্ন অংকের মুক্তিপণ দাবী করা হয় তাঁর মায়ের কাছে।

শেষ পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন তিনি। এরপর থেকে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন অপহরণকারি ওমর ফারুক।

সীতাকুণ্ড থানা সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিপণ দেওয়ার পরও ছেলেকে ফেরত না পেয়ে গত ২৮ জানুয়ারী সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করেন মা রুবি আক্তার।

পরে সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা টিবলু মজুমদার গত ২৯ জানুয়ারী বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি উপজেলার দুর্গম এলাকা থেকে অপহরণকারি ওমর ফারুককে গ্রেপ্তার করেন। আটকের পর প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে তাঁর দুই খালাতো ভাই মো. জামাল ওরফে পুতিয়া ও মো. একরামের সহযোগিতায় হত্যার কথা স্বীকার করেন।

একইদিন হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী পুতিয়াকে রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়ন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ৩১ জানুয়ারী আদালতে হাজির করা হলে অপহরণকারি ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. হেলাল উদ্দিনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জনাববন্দি দেন।

এদিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও ভোমরিয়াঘোনা খালের পাড় থেকে ১৪ জানুয়ারী অজ্ঞাত একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করে ঈদগাঁও তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ। পরে লাশটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

বেশ কয়েকদিন রাখার পরেও লাশের পরিচয় সনাক্ত করতে না পারায় গত ২৪ জানুয়ারী অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে কক্সবাজার পৌরসভার গোলদীঘিরপাড় এলাকার বড় কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়।

সীতাকুণ্ড থানার মাধ্যমে শিশু আকাশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর ঈদগাঁও তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক দেবাশীষ বিশ্বাস দাবী হয়ে গত ৩০ জানুয়ারী আরও একটি হত্যা মামলা করেন।

হত্যা মামলার এজাহার নামীয় আসামী স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেওয়ায় আদালতের বিচারক কক্সবাজার পৌরসভার বড় কবরস্থান থেকে ঈদগাঁও পুলিশের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা লাশটি উত্তোলনের নির্দেশ দেন।

বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা শিশুর লাশ কবর খুড়ে উত্তোলনের পর গলিত লাশটি দেখছে মা ও অন্যান্যরা। ছবি- প্রতিবেদক

ওই নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী হাকিম কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দিনের উপস্থিতিতে দাফনের ৪২ দিন পর মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা টিবলু মজুমদার গতকাল মঙ্গলবার বেলায় ১১ টায় লাশটি উত্তোলন করেন।

সদর উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দিন বলেন, বড় কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়কের সহযোগিতায় কবর খুঁড়ে লাশটি উত্তোলন করা হয়। লাশটি প্রায় গলে গেছে। একারণে পরিচয় সনাক্ত করা যাচ্ছে না।

উত্তোলনের পর ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) সংগ্রহ করার জন্য হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, পরিচয় সনাক্তের জন্য লাশের ডিএনএ’র সাথে তাঁর মায়ের ডিএনএ মেলানো হবে। কারণ লাশের চেহারা গলে গেছে। একারণে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

কক্সবাজার শহরের গোলদীঘির পাড়ের বড় কবরস্থানে ছেলের গলিত লাশ উত্তোলনের পর মুঠোফোনে স্বামীকে জানাচ্ছেন আর কান্না করছেন মা রুবি আক্তার। ছবি- প্রতিবেদক

ছেলের লাশ উত্তোলনের সময় কবরস্থানের উপস্থিত ছিলেন মা রুবি আক্তার। ছেলের গলে যাওয়া লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি বলেন, পাঁচ হাজার টাকা মুক্তিপণ নেওয়ার পরও তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছে অপহরণকারি ফারুক। তিনি ফারুকের ফাঁসি দাবী করেন।

সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা টিবলু মজুমদার বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত হবে। এবং ডিএনএ সংগ্রহ করা হবে। পরে ওই ডিএনএ মায়ের ডিএনএ’র সাথে মেলানোর জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হবে।

তিনি আরও বলেন, আটক দুই আসামী বর্তমানে চট্টগ্রামের কারাগারে আছে। আর ৩য় আসামী একরামকে এখনও আটক করা সম্ভব হয়নি।

আদালতে অপহরণকারি ওমর ফারুকের দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু আকাশের ভাই আজমল হোসেনের (২৪) সাথে সীতাকুণ্ড শীপইয়ার্ডে শ্রমিকের কাজ করতেন অপহরণকারি ওমর ফারুক। গত ১০ জানুয়ারী আজমল হোসেনের সাথে তাঁর বাড়িতে বেড়াতে যান ওমর ফারুক।

সেখানে দুইদিন থাকার পর ১২ জানুয়ারী পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ফুঁসলিয়ে আজমলের ছোট ভাই আকাশকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে কৌশলে বের হয়ে যান ওমর ফারুক। এরপর তারা সীতাকুণ্ড থেকে বাসে উঠে চট্টগ্রাম নিউমার্কেটে যান।

নিউ মার্কেট থেকে আকাশকে তিনি নতুন শার্ট-প্যান্টও কিনে দেন। এরপর রাত আনুমানিক ১২টায় বহদ্দারঘাট থেকে বাসে উঠে পরদিন ভোর চারটায় কক্সবাজার বাসটার্মিনালে পৌছেন।

১৩ জানুয়ারী সারাদিন সমুদ্র সৈকতে ঘুরাঘুরি করার পর আকাশকে নিয়ে ওমর ফারুক ঈদগাঁও মাইজপাড়া এলাকার তাঁর খালার বাড়িতে চলে যান। এবং সেখানে রাত কাটান।

পরের দিন ১৪ জানুয়ারী আকাশকে নিয়ে ফের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যান ওমর ফারুক। এসময় ওমর ফারুক তাঁর ভালাতো ভাই মো. জামাল ওরফে পুতিয়াকেও নিয়ে যান।

ওমর ফারুক ও পুতিয়া সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নামলে শিশু আকাশের কাছে টাকার ব্যাগ জমা রাখেন তারা। ওমর ফারুক ও পুতিয়া গোসল করে দেখতে পান আকাশ তাদের টাকার ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছেন।

কিন্তু জবানবন্দিতে টাকার ব্যাগে টাকা ছিল নাকি অন্যকিছু সেটা উল্লেখ করা হয়নি। পরে তাৎক্ষনিক আকাশের মা রুবি আক্তারের কাছ থেকে মুঠোফোনের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দাবী করেন ওমর ফারুক। কিন্তু রুবি আক্তার তাঁকে টাকা দিতে সক্ষম হননি। পরে রেগে গিয়ে আকাশকে মারধরও করেন তারা। এরপর কয়েক দফা মুক্তিপণ দাবী করা হয়।

পরে তারা আকাশকে ঈদগাঁও ষ্টেশনে নিয়ে যান। ওই সময় ফারুক আগে থেকে মুঠোফোনের মাধ্যমে ঈদগাঁও ষ্টেশনে অপেক্ষা করতে বলেন তাঁর অপর খালাতো ভাই মো. একরামকে। পরে ষ্টেশনে পৌছানোর পর অটোরিক্সার (টমটম) মাধ্যমে আকাশকে তারা ঈদগাঁও ভোমরিয়াঘোনা খালের পাড়ে নিয়ে যান। খালের পাড়ে পৌছানোর পর পুতিয়া আকাশের দুহাত চেপে ধরে।

আর ওমর ফারুক গলাটিপে শিশু আকাশকে হত্যা করে। এসময় অপর খালাতো ভাই একরাম আশপাশের কোন লোকজন আসছে কিনা সেটি খেয়াল রাখেন। পরে আকাশের লাশ খালের পাড়ে ফেলে রেখে তারা পূণরায় মাইজপাড়ায় চলে যান।

সেখানে গিয়ে আবারও আকাশের মায়ের কাছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবী করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন অংকের মুক্তিপণ চাওয়া হয়। পরে শেষ পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে আকাশের মায়ের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে মোবাইল বন্ধ করে দেন ওমর ফারুক।
জানা গেছে, মো. জামাল ওরফে পুতিয়া ও একরাম ওমর ফারুকের খালাতো ভাই। তারা হলেন ঈদগাঁও মাইজপাড়া এলাকার মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে।

নিহত শিশু আকাশের মা রুবি আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী ও ছেলে শীপইয়ার্ডে শ্রমিকের কাজ করে। এতে কোন রকম সংসার চলে তাদের। ওমর ফারুকের চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না তাদের।

তবে যতবার ফোন করে মুক্তিপণ চাওয়া হয়, ততবারই দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা মুক্তিপণও দেন তিনি। কিন্তু তারপরও তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ওমর ফারুকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :