১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১ আশ্বিন, ১৪২৬ | ১৬ মুহাররম, ১৪৪১


পলাশী : সাম্প্রদায়িকতা ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যবাদ

এসএম শুভ
nawab-siraj-uddoula১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, সমৃদ্ধশালী বাংলার শোচনীয় পরাজয়ের দিন, মুসলিম ভারতের পরাজয়ের সুচনার দিন, বেনিয়া বৃটিশদের ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার দিন। তাই এই দিনটি ছিল ইতিহাসে মোড় পরিবর্তনকারী। বলা হয়ে থাকে “২৩ জুনের পরাজয় ছিল সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শক্তি, বর্ণবাদী সাম্প্রদায়িক রাজন্যবর্গ, হিন্দু জমিদার ও তালোভী কিছু সংখ্যক মুসলমানের ষড়যন্ত্রের ফসল”। এই অনুসিদ্ধান্ত দিয়ে পলাশীর পটভূমি নির্ণয়ের প্রবণতা ল্য করা যায়। আবার কিছু ঐতিহাসিক পলাশীর ঘটনাকে মুসলিম শাসকদের ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঐতিহাসিকগণ এই দুইধারার মধ্যে পলাশীর ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সত্য-মিথ্যা গুলিয়ে ফেলেছেন এবং অনেক অন্তর্নিহিত কারণকে এড়িয়ে গেছেন কিংবা ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বস্তুত পলাশীর ঘটনার একপেশে ব্যাখ্যার ফলে এর প্রকৃত ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠোদ্ধার দুরূহ হয়ে পড়েছে। উপরন্তু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের যে পরিকল্পিত বিকৃতি সাধন চলছে, অন্যান্য মুসলিম ইতিহাসের মত পলাশীর ইতিহাসও বিকৃতি এবং বিস্মৃতির কবলে পড়েছে। একপেশে ব্যাখ্যা দিয়ে পলাশীর ঘটনা বিবৃত করলে ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ যেমন সম্ভব নয় তেমনি এর সমূহ বিপদও রয়েছে। তাই এই ঘটনার জন্য এককভাবে কোন সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা যাবে না। মূলতঃ সেদিন স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়নি তাই জাতির অলে স্বাধীনতা হারিয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতা সম্পর্কে তদানিন্তন সমাজ ও রাজন্যবর্গ মতার হাতবদল হিসেবেই ভেবেছিলেন। অথচ প্রকৃত সত্য জনতার কাছে এবং ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরার জন্য কোনো দায়িত্বশীল কণ্ঠ, কলম বা নেতৃত্ব তখন পাল্টা পথ করে নিতে ব্যর্থ হয়। দৃশ্যতঃ সে দিনের ইতিহাসকে যথার্থ অবয়বে আজকের বাঙালির কাছে তুলে ধরতে আমরা এখনো পর্যন্ত কপটতা এবং কৃপণতা দেখাচ্ছি। তাই বর্তমান প্রজন্মকে সেই সত্য উদঘাটনের শপথ নিতে হবে- যার বিপুল যৌত্তিকতা ও বাস্তবতা বিদ্যমান অথচ পলাশীর পটভূমি নির্ণয়ে অধিকাংশ ঐতিহাসিক (ভারতীয় ও ইংরেজ) নিরপেতা বজায় রাখতে পারেননি। এদের মধ্যে কেউ কেউ এর পশ্চাতে বর্ণবাদি উচ্চবর্গ হিন্দুদের ভূমিকা অস্বীকার করে সিরাজ উদ্দৌলাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। আবার কেউ কেউ ইংরেজদের ভূমিকা তুচ্ছ বলে বর্ণনা করেছেন। নবাবী আমলে ধর্মীয় ও অর্থনেতিক স্থিতিশীলতা থাকার কারণে পলাশী যুদ্ধপূর্ব সময়ে কোন প্রজা অসন্তোষ ছিল না বলে অনেকেই দাবী করেন। উপরোক্ত বক্তব্যগুলো কতোটা সঠিক এবং তথ্য ও যুক্তি নির্ভর তার সূক্ষ্ম এবং নিরপে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

পটভূমি নির্ণয়ের সূত্র ঃ পলাশীর পটভূমি নির্ণয়ের েেত্র যে গতানুগতিক ধারা ব্যবহার করা হয় তা সচেতন ভাবে নিরীণ পূর্বক তৎকালীন বাংলার আর্থ- সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার স্বরূপ বিশ্লেষণ করে পলাশীর পটভূমি নির্ণয়ের সূত্র নির্ধারণ করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত। এেেত্র উচ্চবর্ণের হিন্দু-মুসলিম সর্ম্পক, হিন্দু ও মুসলিম বণিক শ্রেণির সর্ম্পক, নবাবের সাথে হিন্দু ও হিন্দু বণিক এবং মুসলমানদের সাথে সর্ম্পক, হিন্দু পুরোহিত ও মুসলিম আলেম উলেমাদের অবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব, ইংরেজ কোম্পানির সাথে হিন্দু বণিকদের সর্ম্পক ইত্যাদির স্বরূপ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরী। পাশাপাশি এ সমস্ত বিষয়ের সাথে পলাশীর ঘটনার সম্পৃক্ততা নিরূপন ও বিশ্লেষণ করে এর অন্তর্নিহিত পাঠোদ্ধার করে এই ঘটনার তাৎপর্য, শিা ও করণীয় সম্বন্ধে একটি অনুসিদ্বান্তে পৌঁছানো গেলেই ঐতিহাসিক সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হবে।

অভিসন্ধী ঃ সমাজের বদলে স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের প্রতি উগ্র আনুগত্যই হলো সম্প্রদায়িকতা। এক কথায় যারা অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অসহিষ্ণু ও বিদ্বেষ পরায়ন তারাই সাম্প্রদায়িক। এই অর্থে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অসহিষ্ণু ও বিদ্বেষ পরায়নতা বহুমাত্রিক হতে পারে। যেমন ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনেতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি। তাই স্ব-স্ব জাতি তাদের প্রভাব বলয় তৈরি করতে গিয়ে পারস্পরিক ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনেতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এবং শুরু হয় সম্প্রদায়িক স্বার্থ বিচার যা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ষড়যন্ত্র বা পেশীশক্তি প্রয়োগ করে আদায় করা হয়। ফলে সমাজে বিভক্তির সৃষ্টির হয় এবং সমাজদেহে এক ধরনের ফাটল তৈরি হয়। বাংলায় মুসলমানদের আগমন পূর্ব সময়ে এই ফাটল ছিল বর্ণহিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে। পরে এটি বাংলার বর্ণহিন্দু -মুলমানদের মধ্যে দেখা দেয়। বস্তুতঃ সাম্প্রদায়িকতার উপর ভিত্তি করে গঠিত এই ফাটলই বাংলার জাতীয় জীবনে বার বার বিপর্যয় এনেছে। এর ফলেই বাংলা স্বাধীনতা হারায় ১৭৫৭ সালে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ সালে বাংলা মুলুক থেকে বিশাল এলাকা (আসাম বিহার উড়িষ্যা) বহিষ্কার ও ঢাকা কেন্দ্রিক প্রশাসনের অপমৃত্যু এবং ১৯৪৭ সালে বাংলার আবার অঙ্গচ্ছেদ ঘটে। এখানে ল্যণীয় যে, সাম্প্রদায়িকতার যে বিষবাস্প বিভিন্ন জাতি বিশেষ করে মুসলিম ও হিন্দু মননে উদগিরন ঘটে তা জাতিতাত্তিক সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তীতে এই সাম্প্রদায়িকতা হিন্দু উচ্চ ও নিম্নবর্ণ, অভিজাত ও সাধারণ মুসলিম এবং আলেম সমাজ, অভিজাত হিন্দু ও অভিজাত মুসলিম ইত্যাদি দ্বন্দ্ব আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ লাভ করে। যদিও সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ও তার সমসাময়িক মুসলিম শাসকবর্গ উদারনৈতিক জাতীয়বাদী নীতি গ্রহণের ফলে নিষ্পেষিত হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনগণ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং বিভিন্ন সুলতানের আমলে রাজকার্য ও রাজ্য পরিচালনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রচুর সংখ্যক হিন্দুদের সম্পৃক্ত করা হয়। পরবর্তীতে হুসেন শাহী আমল, মোগল আমল এবং নবাবী আমলে হিন্দুদের প্রতি এই সুযোগ সুবিধা একচেটিয়া রূপ ধারণ করেছিল। কিন্তু ইলিয়াস শাহী বংশের শেষের দিকে রাজা গনেশ গং এ সমস্ত সুযোগ সুবিধায় তৃপ্ত থাকতে পারলেন না। তারা মুসলিম সুলতানকে মতা থেকে উৎখাত ও ইসলাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. লুৎফুর রহমান বলেন “গনেশ ও তার কূল গুরু পদ্মনাভ নরসিংহ নাড়িয়ালদের ষড়যন্ত্রের অবর্ণনীয় কুফল আরো বহুদূর অবধি গড়িয়েছিল। কারণ ১৪১০ সাল থেকে ১৪১৭ পর্যন্ত মতা দখলের জন্য পরিচালিত ষড়যন্ত্র এই সময়কার মুসলিম সুলতানদের দূর্বল করে ফেলে। সরলচিত্ত এ সব সুলতানগণ কূটকৌশলী হিন্দু সামন্ত পুরোহিত শ্রেণীর বেইমানী শঠতা ও শত্রুতার গহ্বরে এমনভাবে পতিত হন যে, ইলিয়াস শাহী উদার নৈতিক রাষ্ট্রীয় নীতি ও শৃঙ্খলা একেভারে মিছমার হয়ে পড়ে।”
সামন্ত ও উচ্চ বর্ণের হিন্দু ষড়যন্ত্রের কবল থেকে এই যাত্রায় মুসলিম জনপদ রা পেয়েছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে। তা হল সুফি দরবেশগণ ইসলাম ও মুসলমানদের উপর আঘাতকে সাধারণ জনগণসহ রাজশক্তি নিয়ে মুকাবিলা ও দমন করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং অনেকটা সফল ও হয়েছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল রাজপ্রাসাদ ও জনগণের মধ্যে সুসর্ম্পক বজায় থাকার কারণে। এই মুকাবিলার ল্যনীয় বৈশিষ্ট হল, সুলতানগণ এখানে ধর্মীয় পীর আলেমগণকে বুঝাতে সম হন যে, এই সংঘাত শুধু রাজনৈতিক নয় বরং সামাজিক সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিকও বটে। ধর্মীয় নেতাগণ এই বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে শায়খ নূর কুতুবুল আলমের নেতৃত্বে রাজা গনেশকে দমনের সংগ্রামে লিপ্ত হন। তখন থেকে পুনরায় মুসলিম জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধ জাগ্রত হয়। কিন্তু এই ঘটনার ৩৫০ বছর পর ঠিক একই প্রোপটে পলাশীর প্রান্তরে সাধারণ জনগণ নিয়ে আরেকজন নূর কুতুবুল আলম সিরাজের সহায়তায় এগিয়ে আসেননি। তাই হিন্দু অমাত্যবর্গ ও ইংরেজ কোম্পানির ষড়যন্ত্র বিশ্লেষণের পাশাপাশি পলাশীর ঘটনার পটভূমিকায় সাধারণ মুসলিম ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং পীর মাশায়েখদের ভূমিকা নির্ণয় জরুরি। এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর পেতে ইতিহাসের কিছু অনালোকিত দিক সামনে আনতে হবে। যেমন সুলতানী আমলের মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ হুসেন শাহী আমল থেকে তথাকথিত উদার সংস্কৃতি চর্চার কারণে মসুলিম সমাজে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক অবয় সুচিত হয়েছিল যা আঠারো শতকে এসে শাসক সমাজ, আমীর উমরাহ ও ধর্মীয় আলেম উলেমা থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলমানদের সমাজেও সংক্রমিত হয়েছিল। এর ফলে মুসলমানদের আকীদা বিশ্বাস, নৈতিক বৃত্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্যে এক ধরণের দৈন্যতা বিরাজ করে। এই অবস্থায় সামাজিক বিচ্যুতির ফলে শাসকশ্রেণী সাধারণ জনগণ ও আলেম উলেমা, পীর মাশায়েখদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। এমতাবস্থায় রাজা প্রাজা ও রাজ্যের মধ্যে যে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং দেশপ্রেম দরকার ছিল তা বিনষ্ট হয়ে যায়। এ সময়ে বাংলার সূফী ও আলেম সমাজের মধ্যে আরকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন ঘটে। মুঘল যুগে দিল্লী ও বাংলায় রাজপুত, জাঠ ও মারাঠাদের নেতৃত্বে তথাকথিত হিন্দু পুনর্জাগরণ সৃজিত হলে মোগলাই অভিজাত মুসলমান, আমির ওমরাহদের অনৈসলামিক কর্মকান্ডে সুফী ও আলেম সমাজ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেন। এদের একাংশ শরীয়ত পন্থী গোঁড়া মৌলবাদী হয়ে উঠেন আরেক অংশ তরিকত পন্থী যারা সূফীবাদী ভাবধারা বিস্তারে ব্যাপৃত হন। এই সুফীদের দুটি সম্প্রদায়- কাদেরিয়া ও কলন্দরী তরিকার ফকিরেরা। এই ফকির সম্প্রদায় ও অন্যান্য সুফীরা মোগলাই অভিজাতদের ইসলাম বিমুখতা, ভোগ বিলাসিতা ও লম্পট্যলীলার দরুণ মুসলমান সমাজের সমূহ বিপদ ঘনিয়ে আসতে দেখে বিশেষভাবে বিচলিত ছিলেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাদের ভূমিকা ছিল জুলুম বিরোধী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সংহতির অনুকুল। কিন্তু নবাবী আমলে তাদের তেমন কার্যক্রম দেখা যায়নি। এই সময়ে মুসলমানদের মধ্যে গোত্রভিত্তিক দ্বন্দ্ব (শিয়া, সুন্নি, খারেজি) এবং মতাদর্শ ভিত্তিক দ্বন্দ্ব (শরিয়তি, ত্বরিকতী ও মারফতী) প্রকটতা লাভ করে। ফলে ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে নবাব ও প্রাসাদের দূরত্ব বেড়ে যায় এবং সমাজ ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে হোসেন শাহী আমলে সাম্প্রদায়িক হিন্দু জাগরনের যে প্লাটফরম তৈরি হয়েছিল তার মুকাবিলায় মোঘলরা তিন প্রজন্ম নীতির মাধ্যমে শক্ত ভীত তৈরি করে এবং নবাবী আমলে এর চরম বিকাশ ঘটে যার সফল সমাপ্তি ঘটে পলাশীতে সিরাজকে উৎখাতের মধ্য দিয়ে। পরে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিষ দিয়ে সমাজে ছড়িয়েছিল অস্থিরতা ও অসাম্যের মহামারী। এই উপমহাদেশে আজও সেই বিভক্তি বিরাজমান।
মতার দ্বন্দ্ব ঃ নবাবী আমল থেকে পলাশী পটভূমিকার চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হয়। দিল্লীতে য়িষ্ণু মুঘল শক্তির দূর্বলতায় উচ্চ বর্গের হিন্দুদের যে নব উত্থান ঘটেছে তার ঢেউ বাংলাদেশেও এসে পড়ে। আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে প্রাথমিক বিজয় লাভের পর বাংলায় রাজকার্যে হিন্দু অমাত্যদের সংখ্যা ও প্রভাব বৃদ্ধি একান্তই প্রয়োজন ছিল। বাংলার প্রথম নবাব এক কালের ব্রাহ্মণ সন্তান দান্যিাত্যের মুর্শিদ কুলী তার সুব্যবস্থা করেন। আশৈশব মোগলাই পরিবেশ বেড়ে ওঠা ও মোগলাই প্রশাসনে অভ্যস্ত মুর্শিদ কুলী মধ্য, পশ্চিম ও উত্তর ভারতে পরিদৃষ্ট পরিস্থিতির মতো আসন্ন বিপদ এড়াবার আশায় বড় বড় অবাঙালি হিন্দু জমিদারকে হাত করার জন্য নতুন প্রশাসনিক নীতি অনুসরণ করে। তিনি এসব বড় জমিদারকে আদায়কৃত খাজনার কমিশন প্রদানের ব্যবস্থা করেন। মনসবদারী পন্থায় তাদের অধীনে সৈন্যবাহিনী রাখার অনুমতি দিয়ে প্রশাসনিক ও সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিক সংখ্যক উচ্চ বর্ণের হিন্দুদেরকে নিযুক্তি দিয়ে তাদের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে বাংলাদেশের জমিদারিতে হিন্দুদের প্রাধান্য স্থাপিত হয়। এভাবে এদেশে একটি অভিজাত হিন্দু জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। এ সমস্ত অভিজাত দুর্দান্ত প্রতাপশালী হিন্দুরাই বাংলার মুসলমানদের প্রতিপত্তি, মতা খর্ব করার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। লণীয় যে, এসব বর্ণহিন্দু রাজা মহারাজা, কর্মচারীরাই নবাব মহলে বিভেদের উস্কানি দিয়ে তাদেরকে বশীভূত করে নিজেরা উত্তরোত্তর অধিক মতা লাভের প্রচেষ্টায় মেতে উঠেন। এমতাবস্থায় হিন্দুদের (আমাত্য বর্গের) সমর্থন ব্যতীত রাজকার্যের দায়িত্ব পালন অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিচণ আলীবর্দী খাঁ এটা উপলদ্ধি করে কুলিন বর্ণ হিন্দুদের সহায়তা নিয়ে নবাব সরফরাজকে উৎখাত করে অনেকটা পিছনের দরজা দিয়ে মতায় আসেন। এসব হিন্দুদের প্রতি ঋণ পরিশোধ একান্তই প্রয়োজন ছিল। তাই আলীবদী খাঁ তার ষোলআনাই পরিশোধ করেন। আলীবর্দি সিংহাসনে আরোহনের পর থেকে জগৎ শেঠ ও অন্যান্য হিন্দু জমিদারগণ সর্বেেত্র প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। নবাব ও প্রধান সেনাপতি পদ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয় বর্ণ হিন্দুরা, ঢাকার প্রাদেশিক দেওয়ান ছিলেন রাজবল্লভ, বিহারের প্রথম গর্ভনর ছিলেন জানকী রাম, দ্বিতীয় গর্ভনর ছিলেন রামনারায়ণ, তদুপরি নবারের দেওয়ান চিত্তরায়, বাবু বীরুদত্ত, কিরণ চাঁদ ও উমিচাঁদের সহযোগিতায় সারা বাংলার রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রদানের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ছিল জগৎ শেঠের। অর্থের ব্যাপারে অনেক সময় স্বয়ং নবাবকে জগৎ শেঠের কাছে মুখাপেী থাকতে হত। সেনাবাহিনীর প্রধান প্রধান বিভাগের দায়িত্ব ছিল রায় দুর্লভ, মানিকচাঁদ, নন্দুকুমার ও মোহন লালের উপর। এসব রাম-লাল-শেঠদের প্রধান মুরব্বী ছিলেন জগৎ শেঠ। আর এই জগৎ শেঠ গং বাংলায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে সকল ব্যবসা বানিজ্য ও ষড়যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করত। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ৮৫ জন এজেন্ট দ্বারা এদেশে ব্যবসা পরিচালনা করতো। তন্মধ্যে ৮৩ জন ছিল হিন্দু, ২ জন মুসলমান। উক্ত ৮৩ জন হিন্দু এজেন্ট ও জগৎ শেঠ সম্মিলিতভাবে কলিকাতা নগরী গড়ে তোলেন। দণি-পশ্চিম বাংলার সমস্ত বিত্তশালী হিন্দুরাই ছিল কলকাতার অন্যতম বাসিন্দা। এভাবে পলাশী যুদ্ধের প্রোপট নির্মানের লে তারা আর্থ-সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের সাথে সাথে প্রশাসনিক পদগুলোও অধিকার করে বসেছিল। তারা এত প্রতিপত্তি ও অর্থ বলের অধিকারী হয়েছিল যে, শ্রী মজুমদারের ভাষায় “হিন্দু জমিদাররা নবাবের উপর সন্তুষ্ট ছিলনা। অতএব তারা বাংলার মসনদ থেকে মুসলমান নবাবকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠবে এবং মুসলমান শাহী লুপ্ত করতে তৎপর হয়ে উঠবে- তা মোটেই বিচিত্র নয়। এই পরিস্থিতিতে হিন্দু অমাত্যরা শুধুমাত্র নিজেরা কতদূর পেরে উঠবেন সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। সাথে ছিল মুসলিম সেন্টিমেন্টালদের ভয়। এ সন্দেহের কারণেই তারা সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে ইংরেজদেরকে। পলাশী যুদ্ধের প্রাক্কালে কাইভের সাথে বর্ধমান, দিনাজপুর ও নদীয়ার জমিাদারদের পত্র যোগাযোগ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে যে, অগ্রিম আনুগত্য প্রকাশ করে তারা কাইভকে যুদ্ধ যাত্রার দাওয়াত জানান।” হিন্দু রাজন্যবর্গ পরিবেষ্টিত নবাব আলীবর্দী খান ঘূর্ণারেও সেই ষড়যন্ত্রে কান দিলেন না। কিন্তু যখনই ইংরেজ উৎপাত নিরোধের ব্যবস্থা করলেন তখন হাড়ে হাড়ে টের পেলেন, ইঙ্গ-হিন্দু শক্তি কোন এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু তখন অনেক বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস তখন একটি অনিবার্য পরিণতির দিকেই যাচ্ছিল। আলীবর্দির দৌহিত্র সিরাজের েেত্রও বীরভূমের রাজা-মহারাজারা মুর্শিদাবাদে সমবেত হয়ে দেওয়ান ই-সুবা মহারাজা মহেন্দ্রের কাছে অনেকগুলো দাবী পেশ করেন। তাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু দাবি মিটাতে নবাব অপারগ হলে জগৎ শেঠের পরামর্শে তারা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে সিরাজ উদ্দৌলাকে উৎখাতের সিদ্বান্ত গ্রহণ করে। সভার পে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র কলকাতায় মি. ড্রেকের সাথে সাাৎ করে তাকে নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আহ্বান জানান এবং সর্বমুখী সাহায্যের আশ্বাস দেন। এেেত্র ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও হিন্দু রাজন্যবর্গের একটি সমস্যা ছিল। সমস্যাটি তপন মোহন চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেন এভাবে “প্রধানত হিন্দুদের চক্রান্ত হলেও বড় গোছের মুসলমান তো অন্তত একজন চাই। নইলে সিরাজ উদ্দৌলার জায়গায় বাংলার নবাব কে হবেন ? কাইভ তো নিজে হতেই পারেন না। হিন্দু গভর্নরও সকলে পছন্দ করবেন কিনা সন্দেহ। দিল্লীর বাদশা কোনো হিন্দুকে বাংলার গভর্নরী পরোয়ানা দেবেন বলে তো কারো বিশ্বাস হয় না। সুতরাং মুসলমান একজনকে নবাবী মসনদের নেবার জন্য জোগাড় করতেই হবে। জগৎ শেঠরা তাদেরই আশ্রিত ইয়ার লতিফ খাঁকে সিরাজের জায়গায় বাংলার মসনদে বসাতে মনস্থ করেছিলেন। উমিচাঁদেরও এতে সায় ছিল। কিন্তু কাইভের পরিকল্পনা মতে মীর জাফরকেই বাংলার ভাবী নবাব পদের জন্য মনোনীত করে রেখেছিলেন।” মতার দ্বন্দ্ব বিষয়ে শ্রী সুশীল চৌধুরীর ব্যাখ্যাটিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি বলেন “মুশির্দাবাদের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ এবং ইংরেজরা সিরাজ উদ্দৌলার অপসারণ চেয়েছিলেন বলেই পলাশী চক্রান্তের উদ্ভব। উভয়ের কায়েমী স্বার্থের পে সিরাজ ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। নবাব হওয়ার পর প্রথম থেকেই এটা স্পষ্ট যে বাংলার সামরিক ও অভিজাত শ্রেণী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও জমিদারদের নিবিড় জোটবদ্ধতা বাংলার নবাবের পূর্ণ মতার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছিল, সিরাজ উদ্দৌলা তা মেনে নিতে মোটেই রাজি ছিলেন না। নবাব হয়েই তিনি সামরিক ও বেসামরিক উভয় শাসন ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজাতে শুরু করল….। আসলে সিরাজ উদ্দৌলার মতো বেপরোয়া তরুণ নবাব হওয়ায় শাসকশ্রেণীর একটি গোষ্ঠী ভীত ও সস্ত্রস্ত হয়ে উঠে। আগের নবাবদের আমলে এই বিশেষ গোষ্ঠীই সম্পদ পুঞ্জীভবনে লিপ্ত ছিল। এখন তাদের ত্রাসের কারণ সিরাজ উদ্দৌলা হয়তো তাদের সম্পদ পুঞ্জীভবনের পথগুলো বন্ধ করে দেবেন। সৈন্যাধ্যরে পদ থেকে মীর জাফরের অপসারণ, রাজা মানিকচাঁদের কারাদন্ড এবং সর্বোপরি আলিবর্দীর একান্ত বিশ্বস্ত ও প্রভূত মতাশালী হুকুম বেগকে দেশ থেকে বিতাড়নের মধ্যে দিয়ে শাসক শ্রেণির কুচক্রীদল বিপদ সঙ্কেত পেয়ে যায়। এসব সত্ত্বেও ইংরেজদের সক্রিয় সংযোগ ছাড়া পলাশীর ঘটরা সম্ভব হতো না। সিরাজ উদ্দৌলা নবাব হওয়ায় ইংরেজদের কায়েমী স্বার্থও বিঘিœত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সিরাজ নবাব হওয়ার পর ইংরেজ কোম্পানীর কর্মচারীরা ভীষণভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠল, পাছে নতুন নবাব তাদের দুই কল্পতরুকে (ব্যক্তিগত ব্যবসা ও দস্তক) যথেষ্ট অপব্যবহার সমূলে বিনাশ করে বসে। তাই এই তরুণ নবাবকে ধ্বংস করার জন্যই পলাশীর চক্রান্ত। অতএব এই সত্য প্রতিভাত হয়, হিন্দু শক্তি তথাকথিত চানক্যনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করে এই উপমহাদেশে রাম রাজ্যের সূচনা করেছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনাপর্বে।
মুসলিম বাহিনী দ্বারা তা সাময়িক পর্যুদস্ত হলেও হিন্দুরা তাদের স্বীয় শক্তি ফিরে পেতে সর্বদা তৎপর ছিল। বাংলায় রাজা গনেশের মাধ্যমে হিন্দুরা প্রথম পরিকল্পিত কাউন্টার এট্যাকের সুযোগ গ্রহণ করেছিল। ২৩ জুনের পলাশী বিপর্যয়ের মূল নায়ক জগৎ শেঠ মুলতঃ রাজা গনেশদের স্বার্থক উত্তরাধিকারী ছিলেন। গনেশ শিহাবুদ্দীন ও আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহকে শিখন্ডী রেখে প্রকৃত মতা হস্তগত করেছিলেন। আর স্বরূপচাঁদ, জগৎ শেঠ ও তার পিতামহ ফতেহ চাঁদ শাসকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত সৃষ্টি করে (১৭২৪-১৭৬৩) মাত্র ৩৬ বছরে ৭ জন শাসককে বাংলার মতায় বসায় এবং আস্ত-কোন্দলের মাধ্যমে মুসলিম শক্তি নিঃশেষ করে ইংরেজদের হাতে বাংলার স্বাধীনতা বিক্রি করে দেয়।
সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা ঃ চরিত্রগতভাবে সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান রূপের বিভিন্নতা থাকলেও এর মূল বৈশিষ্টটি অতীতে যেমন ছিল বর্তমানেও তাই আছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন কোন জনপদকে নিজেদের কলোনী বানানোর পরিকল্পনা করে তখন সেই জনপদে কল্যাণমূলক দাতব্য সংস্থা বা কোম্পানি স্বীয় দেশের পজিটিভ ইমেজ গড়ে তোলে তাদের নিজস্ব কর্মকান্ড পরিচালনা করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রে জাতিগত বিরোধ সৃষ্টি করে তাতে হস্তেেপর পরিবেশ তৈরি করে। এই পন্থা কাজে না আসলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ দাঁড় করায়। অতঃপর তাতে হস্তপে করে। আজ থেকে ২৫০ বছর আগেও তাই ঘটেছিল। প্রাথমিকভাবে একটি বানিজ্যিক কোম্পানির হাতে সিরাজ উদ্দৌলার পতন ঘটেছিল এবং ১শ বছর পর ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ রাজশক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কলোনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। মূলতঃ উপনিবেশবাদ থেকে সূত্রপাত হয় আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের। বৃটিশ কোম্পানি অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এই উপমহাদেশকে উপনিবেশ হিসেব গড়ে তুলতে প্রথম পদে গ্রহণ করে ১৬৩৩ সালে যখন এদেশে তারা প্রথম বানিজ্যকুঠি স্থাপন করে। ১৬৩৩ সালের মে মাসে মহানদীর মুখে হরিহর পুরে এই কুঠি স্থাপন করা হয়। যেমন বর্তমানে ইউএস এইড, ইউকে এইড, রেডক্রস, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থা : অতীতে ছিল বিভিন্ন চিকিৎসক দল, উপঢৌকন সহ প্রতিনিধি প্রেরণ ইত্যাদি। বর্তমানে ইউনিলিভার, পেপসি, কোকাকোলা, বিভিন্ন তেল কোম্পানি : অতীতে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। এর পরে তারা ১৭৫১ সালে হুগলী শহরে আরেকটি কুঠি স্থাপন করে। এ বছরই বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজা ইংরেজদের এদেশে বিনা শুল্কে অবাধ বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান করেন। ১৬৮০ সাল নাগাদ কোম্পানির বাণিজ্য দেশের সর্বত্র বিস্তার লাভ করে। বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় সরকারের বিরুদ্ধে কোম্পানির নানা অভিযোগ। সরকারের প থেকে কোম্পানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, কোম্পানি শর্ত মোতাবেক বাণিজ্য না করে অসদুপায় অবলম্বন করছে। এভাবে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগকে কেন্দ্র করে ১৬৮৬ সালে পর্যন্ত চলে স্নায়ুুযুদ্ধ। ১৬৯০ সালে কোম্পানি সম্রাট আওরঙ্গজেবের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি করে। এই চুক্তি মোতাবেক কোম্পানি সরাদেশে বার্ষিক ৩ হাজার টাকা রাজস্বের বিনিময়ে বিনাশুল্কে বানিজ্য রকার অধিকার লাভ করে। কোম্পানির আধিপত্য বিস্তারের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধাপ হল, স¤্রাট ফররুখ শিয়ারের ফরমান জারি ও কলকাতায় কোম্পানির কর্র্র্তৃক ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ। ফররুখ শিয়ারের ফরমান দ্বারা দেশের সার্বভৌমত্ব আংশিকভাবে বিলিয়ে দেয়া হয়েছিল বলা যেতে পারে। কোম্পানি সম্রাট ফররুখ শিয়ারের নিকট হতে সুযোগ সুবিধার ফরমান লাভ করলেও মুশির্দকুলী খাঁন সেই ফরমান কার্যকরী করতে অস্বীকৃতি জানান। তার পরবর্তী সুবেদার সুজাউদ্দীন খাঁন ও অলীবর্দী খাঁনের সময়ও অনুরূপ নীতি অনুসৃত হয়। প্রত্যেক সুবেদার অতি কৌশলে কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলেন। কিন্তু আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সেই কৌশলী রাজনীতির অবসান ঘটে এবং শুরু হয় রাজ্য ও নবাবের উপর কর্তৃত্ব খাটানোর বহুমুখী চক্রান্ত। পলাশী যুদ্ধে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জয় লাভের মাধ্যমে যার প্রথম পর্ব শেষ হয়। ইংরেজ কোম্পানির সাম্রাজ্যাবাদী পরিকল্পনা সর্ম্পকে কলকাতার দেশ সাপ্তাহিকীতে (১৮মে ১৯৯১) ‘পলাশী কার চক্রান্ত ?’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে শ্রী সুশীল চৌধুরী লিখেছেন “সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন মহাফেজখানায় যেসব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি, তার পাশাপাশি আগের জানা তথ্য ও সমসাময়িক ফার্সী ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে সমগ্র বিষয়টির পুণর্মূল্যায়ন সম্ভব।” তিনি আরো বলেন “বস্তুতঃ কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানীর প্রধান ইঞ্জিনিয়ার স্কট পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে বাংলা বিজয়ের এক বিশদ পরিকল্পনা পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছিলেন। তাতে এ গৌরবময় ঘটনায় কোম্পানী কি পরিমাণ লাভবান হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা ছিল। স্কট এটাও জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, বাংলা জয় করতে পারলে (ওসসবহং মধরহং ড়িৎষফ ধপপঁৎব ঃড় ঃযব ঊহমরংয ঘধঃরড়হ) রাজ্য বিজয় সম্বন্ধে বাংলায় কোম্পানীর কর্মচারীদের মধ্যে একটা স্পষ্ট মতলব ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ল্য করা যায়। আসলে ১৭৪০ সালের শেষের দিকে ও পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে ইংরেজ কোম্পানীর কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার মতোই সমস্যাশঙ্কুল পরিস্থিতিতে পড়েছিল। কোম্পানির কর্মচারীদের সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তিগত বানিজ্য স্বার্থকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ফরাসীদের বিতাড়ন এবং রাজ্য জয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক মতা দখলের প্রয়োজন ঘটেছিল। তাতে শুধু যে আন্তঃ দেশীয় এবং অভ্যন্তরীণ বানিজ্যের েেত্র ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থ রার উন্নতি ঘটবে তা না, উৎপাদন ত্রে থেকে সরবরাহ, বাজার-হাট, ব্যবসায়ী, তাঁতী ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধিপাবে। এ কথা যে শুধু পশ্চাৎ সমীাতেই ধরা পড়েছে তা নয়, তৎকালীন কোম্পানীর কর্মচারীদের বিবৃতি ও কাজকর্মের মধ্যে দিয়েও প্রকাশ পেয়েছে।” স্কটের বাংলা বিজয়ের পরিকল্পনা ফ্যাম্বল্যান্ড ও ম্যানিংহামের কাইভকে লেখা চিঠি (১ সেপ্টেম্বর ১৭৫৩) যাতে ইংরেজ বাণিজ্যের বিশেষ করে ব্যক্তিগত ব্যবসার ক্রমাবনতির কথা করুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কোম্পানীর বেচাকেনায় দাদনি থেকে গোমস্তা ব্যবস্থার পরিবর্তন নবাবের প্রতি ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল ও গভর্নর ড্রেকের অনমনীয় এবং মারমুখো মনোভাব এসবই ইংরেজদের রাজনৈতিক মতা দখলের যে অভিপ্রায় তারই নির্দেশক। মূলতঃ বানিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করতে ইংরেজ কোম্পানির রাজ মতা দখল কিংবা এর উপর আধিপত্য বজায় রাখা একান্ত দরকার ছিল।
শেষকথা ঃ মুলতঃ সুপরিকল্পিতভাবে পলাশী নাটকের যে মঞ্চায়ন আমরা দেখেছি তাতে একদিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ও মতা কুগিত করার দ্রোহ অন্যদিকে ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের স¤্রাজ্যবাদী খায়েশ মেটানোর সূদুর প্রসারি পরিকল্পনা- এই ত্রিমাত্রিক প্রচেষ্টা মাকড়সার জালের মত মসনদ দখলের দৌড়ে এমনভাবে ভারসাম্যপুর্ণ সহঅবস্থান করেছিল যে, পলাশিতে সিরাজের পতনের পর বক্সারে এসেও সেই জাল থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। অর এই ত্রিশঙ্কু প্রচেষ্টার ভারসাম্য বজায় রাখতে ফ্রন্টলাইনে থেকে প্রত্য ও প্ররোভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে উচ্চবর্ণ হিন্দু অমাত্যবর্গ, ইংরেজ কোম্পানি ও চানক্যবাদীদের কতিপয় মুসলিম পেইড এজেন্ট।
পুনশ্চ ঃ সমসাময়িক অনেক ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, শাসকশ্রেণি, অমাত্যবর্গ ও সাধারণ জনগণের যদি দেশপ্রেম থাকত তাহলে পলাশীর বিপর্যয় এড়ানো যেত। দেশপ্রেম প্রসঙ্গে ড. এমাজ উদ্দিন বলেন “বর্তমান সময়ে দেশপ্রেমের যে বিকাশ ঘটেছে কিংবা দেশপ্রেম শব্দটি যে ব্যাপক অর্থ বহন করে, সে সময় তার বিকাশ ঘটেনি। ফলে সাধারণ জনগণ পলাশীর ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজন্যবর্গের মধ্যে মতার পালাবদল হিসেবেই দেখেছে।” সে সময় জনগণের অসচেতনতা ও দেশপ্রেমহীনতা নিয়ে জনৈক ইংরেজ লেখক রূপক অর্থে লিখেছেন “পলাশীতে সিরাজের পরাজয়ের পর লর্ড কাইভ যখন নবাবের ধনভান্ডার খুললেন এবং ধনভান্ডার দেখে তিনি এতই বিস্মিত হলেন যে, নিজের গায়ে চিমটি কাটেন এবং ভাবতে লাগলেন, একজন নবাবের এত সম্পদ থাকে কি করে। পরবর্তীতে সে সব সম্পদ লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১শ টি জাহাজ ঠিক করা হল।” তার মতে, স্বর্ণের,বোঝাই করা জাহাজ গুলোতে নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা জনগণ যদি একটি করে হলেও ঢিল ছুঁড়ত তাহলে জাহাজ গুলো ডুবে যেত কিন্তু জনগন তা করেননি । তারা স্রেফ মনে করেছে এই সম্পদ কেবল রাজারই, তাদের নয়। তবে সাম্রাজ্যবাদী অভিষ্ট হাছিলে ব্ল্যাকহোল ট্র্যাজেডির মতোই এই গালগল্প গুলো ঐতিহাসিক অতিকথন হিসেবেই পরিতাজ্য হবে।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :

error: Content is protected !!