২১ অক্টোবর, ২০১৯ | ৫ কার্তিক, ১৪২৬ | ২১ সফর, ১৪৪১


বিবিএন শিরোনাম

ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাহিত্য ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম-আরাকান ও বার্মার ঐতিহাসিক সম্পর্ক

আমরা সবাই জানি, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট টু কক্সবাজারের প্রধান সড়কটির নাম আরাকান সড়ক। এ সড়কের দু‘পাশে গড়ে উঠেছে শত শত মুসলিম জনপদ। এসব জনপদের সাথে আরাকান রাজ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড় ও ঐতিহাসিক। বাংলা সাহিত্যের রয়েছে তিন যুগ আর যুগান্তরের সিঁড়ি বেয়েই সমৃদ্ধ হয়ে উঠে আজকের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। প্রাচীন যুগ তো চর্যাপদের সীমানায় আটকে আছে। মধ্য যুগের সোনালি পর্ব দখলে রেখেছে আরাকানের রোসাঙ্গ রাজসভা। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আরাকান অঞ্চলটি আজ ‘মিয়ানমারের ‘রাখাইন স্টেট’ নামকরণ করা হলেও এক সময় এটি স্বাধীন রাজ্য ও মুসলমান অধ্যুষিত শান্তিপূর্ণ জনপদ ছিল। ১৭৮৪ সালে বার্মা রাজা বোদাপায়া আরাকান দখল করে বার্মার অধীনে নেন। এর আগে প্রায় সাড়ে তিন শত বছর ধরে আরাকানের স্বাধীন সত্ত্বা, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ইতিহাস পাওয়া যায়। ১৬৬৬ সালে মুঘল স¤্রাট বাদশাহ আলমগীরের মামা সুবেদার শায়েস্তা খান কর্তৃক চট্টগ্রাম দখলের আগে চট্টগ্রামও ছিল আরাকানের অধীভূক্ত। চট্টগ্রামে মুসলমানদের প্রভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে আরাকানেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ে। আরাকানের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। তারা এখানে প্রথম বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠী। তাদের হাতে পরিপুষ্টি লাভ করেছে আরাকানের যশ-খ্যাতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য।
আরাকানকে বাংলা সাহিত্যে রোসাং বা রোসাঙ্গ নামে চেনা যায়। আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে অন্যতম হলেন দৌলত কাজী- তিনি চট্টগ্রামের রাউজান থানাধীন সুলতানপুর গ্রামের কাজী বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি আরাকান রাজসভায় কাজীর পদে নিযুক্ত ছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে তিনি সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী কাব্য রচনা করেন।
মহাকবি আলাওল-বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি। কেউ কেউ বলেন, তার জন্মস্থান হচ্ছে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেয়াবাদে। এখানে এখনও আলাওল দীঘি ও আলাওল মসজিদ কবির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিরাজ করছে। তিনি আরাকানে অশ্বারোহী সৈন্য পদে চাকরি করলেও আরাকানের মুসলিম মন্ত্রীদের সুনজরে আসেন এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৬৫১ সাল থেকে ১৬৭৩ সালের মধ্যে কাব্য রচনা করেন। চিতোরের রাণী পদ্মিনীর ঐতিহাসিক প্রণয় কাহিনী নিয়ে আলাওল রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’। কবির অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে তোহফা, সেকান্দরনামা, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল, সপ্তপয়কর, সঙ্গীতন শাস্ত্র প্রভৃতি। পদ্মাবতী কাব্যে ‘সৎকীর্তি মাগনের প্রশংসা’ অংশে কবি আরাকানের অমাত্যসভা কর্তৃক মুসলমানদের জ্ঞান চর্চা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ইসলামের প্রভাব বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। এখানে তিনি উল্লেখ করেছেন-“বহু মুসলমান সব রোসাঙ্গে বৈসন্ত/সদাচারী কুলীন পন্ডিত গুণবন্ত” ॥
কোরেশী মাগন ঠাকুরও মধ্যযুগের একজন মৌলিক কবি। মধ্য যুগে স্বাধীন রোসাঙ রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। মৌলিক রচনার সংকটকালে কোরেশী মাগন ঠাকুরের চন্দ্রাবতী কাব্য একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়। কবি দৌলত কাজীর সমসাময়িককালের কবি ছিলেন মরদুন। পূঁথি গবেষক আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ তার নাম মরদুন নুরুদ্দীন বলে উল্লেখ করেন। কবি মরদন রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হল ‘নসীহতনামা’। আরাকানের অমাত্য সভার পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কবি আবদুল করিম খোন্দকার। তিনি আরাকানেই জন্ম গ্রহণ করেন। তার প্রপিতামহ রসূল মিঞা আরাকানের রাজার ‘ট্যাক্স কালেক্টর’ হিসেবে কাজ করেন। পিতামহ মদন আলী আরাকানের রাজার দোভাষী বা ইন্টারপ্রেটর হিসেবে রাজা ও বিদেশী বণিকদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার ক্ষেত্রে অনুবাদকের কাজ করতেন। তিনি তিনটি কাব্য রচনা করেন- তা হচ্ছে ‘দুল্লাহ মজলিশ,হাজার মাসায়েল এবং তমিম আনসারী। আরাকানের প্রশাসন প্রভাবিত কবিদের মধ্যে সপ্তদশ শতকের শক্তিশালী কবি নসরুল্লাহ খোন্দকার। এ কবির তিনটি প্রধান কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায় যথা- জঙ্গনামা, মুসার সওয়াল ও শরীয়তনামা। শুজা কাজী নামে পরিচিত আরাকানের সরদার পাড়ার অধিবাসী কবি আবদুল করিম অন্যতম কবি ছিলেন। তিনি ‘রোসাঙ্গ পাঞ্চালা’ নামে আরাকানের ইতিহাস সংবলিত কাব্যটি রচনা করেন। সেই সাথে আরাকানের রাজধানী ¤্রােহংয়ের কবি আবুল ফজলের আদমের লড়াই;আরাকানের কাইমের অধিবাসী কাজী আবদুল করিমের রাহাতুল কুলুব,আবদুল্লাহর হাজার সওয়াল, নূরনামা, মধুমালতী, দীরগে মজলিশ; কাইমের আরেক নাগরিক ইসমাঈল সাকেবের ‘বিলকিসনামা’; কাজী মোহাম্মদ হোসেনের আমির হামজা, দেওয়াল মতি ও হায়দরজঙ্গ প্রভৃতি আরাকানের উল্লেখযোগ্য কবি ও কাব্যগ্রন্থ।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির অধিবাসী কিংবদন্তি ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরী (১৮৭০-১৯৪৪) ছিলেন বার্মার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষা-সমাজসেবায় ব্যাপক অবদান রাখেন আরাকান ও রেঙ্গুনে। ১৯০৫ সালে পিতা ব্যবসায়ী নূর আলী প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল-বার্মা স্টীম নেভিগেশন কোম্পানি পরিচালনার ভার আবদুল বারী চৌধুরী ১৯২৮ সালে নিজ হাতে নিয়ে বাংলা-বার্মায় সমুদ্র পথে যোগাযোগের দ্বার উন্মুক্ত করেন। বার্মার মুসলমানদের কল্যাণে তিনি গড়ে তোলেন বেঙ্গল মোহামেডান এসোসিয়েশন, চট্টল সমিতি, বার্মা লেবার এসোসিয়েশন,কেটেল ইউনিয়ন, চে¹ী থানানটো সুন্নী কবরস্থানসহ বহু মসজিদ-মাদরাসা। তিনি বার্মায় বসবাসকারী ৩৪ লক্ষ বাংলা ভাষা-ভাষী মুসলমানদের খবরা-খবর ও চিন্তা-চেতনার ঐক্য সাধনের জন্য ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামের সাহিত্যিক ফররুক আহমদ নিজামপুরীর সম্পাদনায় ‘বাংলা গেজেট’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তদীয় জামাতা সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও এ.কে. খান শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা এ.কে. খান (১৯০৫-১৯৯১) এর বিয়েও হয় বার্মায়। মাওলানা মুনীরুজ্জমান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ১৯২৭ সালে রেঙ্গুনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক তৎপরতা পরিচালনা করেন। হাটাহাজারী মাদরাসার প্রথম ছেরপোরস্ত এবং যার নামে পটিয়া মাদরাসার নামকরণ হয় সেই মাওলানা যমীরুদ্দীন রহ. (১৮৭৮-১৯৪০) ইমামতি ও পড়াশোনা করেন রেঙ্গুনে। মাওলানা হাফেজ আহমদ প্রকাশ চুনতীর শাহ সাহেব (১৯০৪-১৯৮৩) তো ইমাম থাকাকালে মায়ানমারেই এক মসজিদে আধ্যাত্মিক মর্তাবা লাভ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. আনওয়ারুল হক খতীবী (১৯৫১-২০১২)‘র বাবা সাতকানিয়ার হাফেজে হাদীস খ্যাত মাওলানা মাহমুদুল হক খতীবী ও তদীয় চাচা মাওলানা ইয়াকুব দীর্ঘদিন ধরে বার্মার আরকাটি জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব ছিলেন। বিশিষ্ট উর্দু কবি হাকীম ইসমাঈল হিলালী (১৯১৭-১৯৮৮) ও আবু কাওয়াল (১৯১১-১৯৭৫) যশ-খ্যাতি অর্জন করেন রেঙ্গুনে। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর ড. আবু বকর রফীকের পিতা মাওলানা আবু তাহের মুহাম্মদ নাজের (১৯১৩-১৯৮৫) বার্মার টংবু মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম জজ কোর্টের সাবেক এজিপি এডভোকেট আবু মুহাম্মদ য়্যাহ্য়্যা ( ১৯৩৪-২০০৭) এর বাবা এম. আমীন উল্লাহ রেঙ্গুন, মৌলমেন ও মান্দালয়ে বার্মা অয়েল কোম্পানির এজেন্ট ‘মেসার্স মোখলেছ এন্ড সন্স’ নামক নির্মাণ ফার্মের এটর্নি এবং দাদা আনওয়ার আলী মাস্টার ছিলেন বার্মায় সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী- মৃত্যুর পর তাকে সেখানেই দাফন করা হয়। বায়তুশ শরফের রূপকার শাহ মাওলানা আবদুল জব্বার (১৯৩৩-১৯৯৮) এর জন্মই তো হয় বার্মার থাংগু জেলায় পিনজুলুক বাঙ্গালী বস্তিতে, তার বাবা সেখানকার এক মসজিদের ইমাম ছিলেন। হযরত মাওলানা হামেদ হাসান আজমগড়ী রহ. এর ঘনিষ্ট খলীফা মাওলানা আবদুস সালাম আরাকানী রহ. এর বহু খলীফা ও মুরীদ রয়েছে আমাদের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। এছাড়া আমাদের আরো বহু দাদা-পরদাদা ও মুরব্বী ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আরাকান ও বার্মায় গমন করেন। তাদের অনেকে সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুলে প্রজন্ম পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। আজ তাদের পুত্র-নাতী-পূতীদেরকেই বার্মার মগ-সেনারা জীবন্ত দগ্ধ করেছে এবং ভিটেবাড়ি ছাড়া করেছে। সেখানে বর্বর রাখাইনরা ধর্ষণ ও হত্যাকে সহজসাধ্য করে তোলেছে। পৈশাচিক কায়দায় নারী ও শিশুদের হত্যা করে সভ্যতার গায়ে কলংক লেপন করেছে। যুগ যুগ ধরে অসহায় ও ভাগ্য বিড়ম্বিত এ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আমরা কিছুতেই পর ভাবতে পারি না। তাদের সাথে আমাদের বহুবিধ ঐতিহাসিক সম্পর্ককে ভুলে যাওয়া সমীচীন হবে না। তাদের জন্য সাধ্যানুসারে সবকিছু করা আমাদের মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব। মানুষ মানুষের জন্যÑএ অনুভূতি থেকে আমাদের সবাইকে মজলুমের পাশে দাঁড়াতে হবে। আসুন, মজলুম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলি। হে আল্লাহ! তুমি বিপন্ন মানবতা রক্ষায় আমাদের কাজ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :