২১ অক্টোবর, ২০১৯ | ৫ কার্তিক, ১৪২৬ | ২১ সফর, ১৪৪১


বিবিএন শিরোনাম

প্রতি ঘনফুট বালুর কমিশন ১৮ টাকা :

মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে ‘কমিশন বাণিজ্যের’ হিড়িক

দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প বলে পরিচিত কক্সবাজারের মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের অভ্যন্তরে ‘কমিশন বাণিজ্যের’ হিড়িক পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের যে কোনো কাজেই কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি সীমা ছাড়িয়েছে। একমাত্র কমিশনের কারণেই প্রকল্প ভরাটের ৪ টাকা মূল্যের প্রতি ঘনফুট মাটির দাম উঠেছে ২২ টাকায়। অনুরূপ মাসিক ৩২ হাজার টাকা বেতনের একজন কর্মচারীর নিকট থেকে কমিশন কেটে নেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রকল্পের উন্নয়নে যেকোনো ধরনের মালামাল ক্রয়েও চলছে কমিশন বাণিজ্য।

সরেজমিন গিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এভাবে লাগামহীন কমিশন বাণিজ্যের কারণে বৃহৎ প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয়ও ক্রমশ বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। জানা গেছে, ২০১৪ সালের দিকে প্রকল্পের যাত্রা অবস্থায় প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা। দ্বিতীয় দফায় নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার কোটিতে। পরবর্তীতে আরো এক দফায় বাড়িয়ে করা হয় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এমনকি সর্বশেষ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ হাজার কোটিতে দাঁড়িয়েও স্থির নেই।

গতকাল সোমবার প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করে জানান, কমিশনসহ আরো নানাবিধ কারণে প্রকল্পের ব্যয় যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা বলা মুশকিল। গত ৫ বছরে প্রকল্পটির কাজে অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে শতকরা ২৫ ভাগে। আগামী ২০২৩ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

গতকাল সোমবার প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে। এই সভায় প্রকল্পের কমিশন বাণিজ্যের ভয়াল চিত্র ফুটে উঠেছে। সভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে সেটি হচ্ছে প্রকল্পের নিরাপত্তাজনিত ব্যাপার। তদুপরি গত তিন বছর ধরে প্রকল্পটি ভরাটের জন্য লাখ লাখ ঘনফুট মাটি এবং বালু উত্তোলন করা হলেও এক টাকাও সরকারি রাজস্ব আদায় করা হয়নি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন এ সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন- ‘দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্পটিতে সারা দেশ থেকে নানা শ্রেণী পেশার শত শত লোক এসে চাকরি করছেন। অনেকেই করছেন প্রকল্পের ঠিকাদারি ও সরবরাহের ব্যবসা। এসব লোকজনের প্রকৃত পরিচয় কারো জানা নেই।’ তিনি বলেন, প্রকল্পটির মাটি ভরাটের কাজে রয়েছেন দেশের একজন বড় মাপের যুদ্ধাপরাধীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন, যুদ্ধাপরাধীর এই আত্মীয় তার পরিচয় গোপন রেখেই প্রকল্পে কাজ করছেন। তার ধারণা-প্রকল্পে দেশের নানা প্রান্তের চাকরিরত কয়েক হাজার লোকজনের মধ্যে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট লোকজনও থাকবেন না তা নিশ্চিত করা বলা যাবে না। নিরাপত্তাজনিত কারণে অবিলম্বে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত লোকজনের পুলিশ ভ্যারিফিকেশন রিপোর্ট নিশ্চিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভায় বিভিন্ন ব্যক্তির আলোচনায় উঠে এসেছে প্রকল্প অভ্যন্তরের কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টিও। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা আরো জানান- ‘আমার গ্রামের বাড়ি মহেশখালী দ্বীপে। এজন্য আমি প্রকল্পটির নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখি।’ তিনি বলেন, জাপান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা (জাইকা) এবং বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি নামের একটি বেসরকারি সংস্থা।

প্রকল্পটি ভরাট করা হচ্ছে সাগর তীরের ৩০ ফুট চিংড়ি ও লবণ মাঠের নিচু এলাকা ভরাট করে। সাগরের তীরে যেখানে মাত্র কয়েক বছর আগেও করা হত চিংড়ি ও লবণ চাষ সেখানেই এখন গড়ে উঠছে তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প। এক হাজার ৪১৪ একর নিচু ভূমি ভরাটে কমপক্ষে এক কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট মাটি ও বালুর দরকার। প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রেখে বলেন, ইতিমধ্যে এক কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের মতো বালু ও মাটি প্রকল্প স্থানে ফেলা হয়েছে। এ পরিমাণ মাটি ও বালু সরবরাহে কমিশন বাণিজ্যেই যাচ্ছে প্রতি ঘনফুটে প্রায় ১৮ টাকা।

সভায় উপস্থিত স্থানীয় মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাষ্টার মোহাম্মদুল্লাহ জানান, মাতারবাড়ি চারদিকের সাগর ও নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে প্রকল্পে ভরাট করা হচ্ছে। প্রতি ঘনফুট বালু স্থানীয় লোকজন সংগ্রহ করে দিচ্ছে চার থেকে সাড়ে চার টাকায়। সর্বশেষ সেই বালু আরো কয়েক হাত বদলে প্রকল্পে ভরাটে যাচ্ছে প্রতি ঘনফুট ২২ টাকার বিনিময়ে। মাঝখানে কমিশন যাচ্ছে প্রতি ঘনফুটে ১৮ টাকা করে। তদুপরি দ্বীপের চারিদিক থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে পুরো দ্বীপটিই এখন ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলেও আশংকার কথা জানান ইউপি চেয়ারম্যান।

ওদিকে প্রকল্পে কর্মরত কয়েক শ নিরাপত্তা কর্মীসহ অন্যান্য চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও কাটা হচ্ছে কমিশন। মাতারবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এনামুল হক চৌধুরী রুহুল কালের কণ্ঠকে বলেন- ‘প্রকল্পের একজন নিরাপত্তাকর্মীর মাসিক বেতন ৩২ হাজার টাকা হলেও তার কাছ থেকে কমিশন কেটে নেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। অনুরূপ আরো প্রত্যেক চাকরিজীবীর নিকট থেকেই এভাবে কেটে নেওয়া হয় কমিশনের টাকা।’

এ বিষয়টির ব্যাপারে গতকাল কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানির কর্মকর্তাদের নিকট জেলা প্রশাসক জানতে চান। উত্তরে কম্পানির কর্মকর্তারাও কমিশন কেটে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তারা জানান, প্রত্যেক চাকরিজীবীর বেতনের টাকা স্ব স্ব নামে চেকের মাধ্যমে দেওয়া হয়। তারপরেও চাকরিজীবীদের নিকট থেকে নগদ টাকা নিয়ে ফেলা হয়। কম বেতনের কারণে চাকরিজীবীরা এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত ক’দিন আগে মাতারবাড়িতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মচারীদের অভিযোগ নিয়োগ দেওয়া কম্পানির লোকজন চাকরি থেকে বরখাস্তের হুমকি দিয়ে বেতন থেকে কমিশনের নগদ টাকা আদায় করে নেন।

এসব বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন- ‘বালু ও মাটি উত্তোলনের জন্য প্রতি ঘনফুট সরকারের নির্ধারিত হারের রাজস্ব আদায় করা হয়ে থাকে। এ টাকা আদায়ের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ জেলা প্রশাসক বলেন, প্রকল্পের নিরাপত্তাজনিত বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর পুলিশ ভ্যারিফিকেশনেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রকল্পের উন্নয়ন কাজের কমিশন বাণিজ্য বন্ধেও কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান জেলা প্রশাসক।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :