১৪ অক্টোবর, ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন, ১৪২৬ | ১৪ সফর, ১৪৪১


বিবিএন শিরোনাম
  ●  র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলিতে যুবলীগ নেতা নিহত   ●  নাইক্ষ্যংছড়ির তিন ইউপির ভোট আজ : বহিরাগত ঠেকাতে বারটি তল্লাশিচৌকি   ●  কক্সবাজারে শতাধিক বৌদ্ধ বিহারে প্রবারণা উৎসব শুরু   ●  আলীকদমে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ২, আহত ১৩   ●  মহেশখালীতে জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে র‌্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্টিত   ●  আঘাত হেনেছে প্রলয়ঙ্করী টাইফুন, নিহত ১১   ●  রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ করবে সেনাবাহিনী- কক্সবাজারের সেনাপ্রধান   ●  যুবলীগের প্রত্যেককে ভালো মানুষ ও ভালো নেতা-কর্মী হতে হবে : সোহেল আহমদ বাহাদুর   ●  রোহিঙ্গাদের যারা ভোটার করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে : অতিরিক্ত সচিব   ●  যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে বন্দুক হামলা, নিহত ৪

সদরের খরুলিয়া এখন ‘অপরাধের গ্রাম’

এক সময় ‘ঈমানদার’ এলাকা হিসেবে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম পর্যন্ত বেশ সুপরিচিত ছিলো ঝিলংজা ইউনিয়নের বৃহত্তর এলাকা (কয়েকটি খন্ড গ্রাম নিয়ে গঠি) খরুলিয়া। এখানে জন্ম হয়েছে বহু খ্যাতনামা ইসলামী আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। এসব আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের প্রভাবে শত বছর ধরে এলাকাটিতে ইসলামী ভাবধারার পরিবেশ বিরাজমান ছিলো। এই প্রভাবে এখনকার মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন অতিবাহিত করেছেন অত্যন্ত সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে। ছিলো না সামাজিক অবক্ষয়মূলক কর্মকান্ড আর ধর্ম বিরোধী রীতিনীতি। সন্ত্রাস, মাদকসহ কোনো অনাচার গ্রাস করতে পারেনি এই গ্রামটিকে। ছিলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য। হিন্দুসহ সংখ্যালঘু লোকজনও ছিলেন শতভাগ নিরাপদ। কিন্তু ‘ঈমানদার’ খরুলিয়ার সেই চিত্র এখন শুধুই অতীত। এমন আদর্শবান গ্রামটি এখন পরিণত হয়েছে ‘অপরাধের গ্রাম’-এ। সন্ত্রাস, মাদক এবং মারামারি ও হানাহানিসহ নানা অপরাধে ভরে উঠেছে এই গ্রামটি। সেখানে এখন দিন দুপুরে হয় ডাকাতি, ছিনতাই এবং প্রকাশ্যে চলে ইয়াবাসহ মাদকের বিকিকিনি। সম্প্রতি মসজিদে জুমার নামাজরত মুসল্লীকে কোপানোর মতো বিরল জঘন্য ঘটনাও সেখানে ঘটেছে।

প্রবীণ লোকজন এবং কিছু দালিলিক সূত্র মতে, কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের বৃহত্তর গ্রাম ছিলো খরুলিয়া। গ্রামটি ভেতরে আবার রয়েছে খন্ড খন্ড গ্রাম। এসব গ্রামের আবার আলাদা আলাদা নামও রয়েছে। ধর্মীয় শালীনতা ও সামাজিক রক্ষণশীলতাই এসব গ্রামের ঐতিহ্য। দীর্ঘকাল ধরে সে পরিবেশ বিরাজমান থাকায় এই খরুলিয়া জন্ম নিয়েছে বহু ইসলামী আধ্যাত্মিক ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। এই আধ্যাত্মিক ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের দ্বারা গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেই সাথে গড়ে উঠে বড় বড় বেশ কয়েকটি মসজিদ। এসবের পাশপাশি স্কুলসহ সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।

সূত্র মতে, ছিলো না সন্ত্রাস, মাদক, চুরি-ডাকাতি, মারামারি, হানাহানিসহ কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ড। এছাড়াও অন্য কোনো ধর্ম ও সামাজ বিরোধী অনাচারও প্রায় ছিলো না। প্রায় প্রতিদিনই ওয়াজ-নসীহতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আয়োজন হতো। সেখানে সব মানুষ সমবেত হতেন। সুখে-দুঃখে পরস্পর পরস্পরের সহযোগিতায় সবাই সুখী-সুন্দর জীবন অতিবাহিত করতেন। গ্রামটি প্রায় শত বছর ধরে এমন সুন্দর পরিবেশ বজায় ছিলো। কিন্তু সেই দিন এখন আর নেই!

স্থানীয়রা বলেছেন, খরুলিয়ার শত বছরের সেই লালিত ঐতিহ্য এখন আর নেই। গ্রামটি এখন তার ঠিক উল্টো পিটে চলছে। সেই সুন্দর পরিবেশ আর ধর্মীয় পরশ থেকে এখানকার মানুষগুলো অনেক দূর ছিটকে পড়েছে। সেখানকার অনেক মানুষ এখন নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। এসব অপরাধী ব্যক্তিরা শুধু নিজ ও পরিবারকে ধ্বংস করেনি; তারা পুরো গ্রামকে কুলষিত করে ফেলেছে এবং ভেঙে দিয়েছে সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে।

বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১২ থেকে ১৫ বছর আগে থেকে খরুলিয়ার সুন্দর পরিবেশেষে পঁচন শুরু হয়। গাঁজা, ফেনসিডিল দিয়েই বৃহত্তর খরুলিয়ার ধ্বংসের শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে ঢুকে পড়ে মদ ও ইয়াবা। খরুলিয়ার চারিদিকে খাল ও বিভিন্ন ইউনিয়নের সীমান্ত থাকায় সেখানে ইয়াবাসহ মাদক সহজে ঢুকে পড়ছে। সম্প্রতি ক্রসফায়ারে নিহত রাজমিয়ার পরিবারের মাধ্যমেই খরুলিয়ায় অপরাধ প্রবণতা প্রবেশ করে। রাজা মিয়ার ভাই লিয়াকতই প্রথমে মাদকের বিস্তার ঘটান সেখানে। সে তার ভাই দেলোয়ার হোসেন ও শওকত আলী পুতুকে সাথে নিয়ে এলাকার বেশ কয়েজনকে নিয়ে গড়ে তোলে সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট ক্রমান্বয়ে জড়িয়ে পড়ে না সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। এভাবে তারা তৈরি একক আধিপত্য।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, রাজামিয়ার পরিবার থেকে দেখাদেখিতে অন্যরাও এসব অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এক পর্যায়ে তা পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। অর্থ আয় ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জিততে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ক্রমান্বয়ে এলাকার উঠতি যুবকসহ বেশ কিছু মানুষ এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তিন/চার বছরের মধ্যে তা বৃহত্তর খরুলিয়াজুড়ে বিস্তার হয়ে পড়ে। এভাবে পাড়ায় তৈরি হয় ইয়াবা ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসীসহ নানা অপরাধী।

স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, বর্তমানে বৃহত্তর খরুলিয়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কয়েক’শ অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে রয়েছে কোনারপাড়ার মৃত জাফর আলমের পুত্র জসিম উদ্দীন (হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরিসহ ১২/১৪ মামলা আসামী), একই পাড়ার মৃত ফকির আহমদের পুত্র জুহুর আলম (শীর্ষ ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসায়ী। কিশোর গ্যাংয়ের গড়ফাদার), সুতাচরের ইউসুফ আলীর পুত্র দেলোয়ার হোসেন (সম্প্রতি ক্রসফায়ারে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজা মিয়ার ভাই (মাদক ও মোটরসাইকেল ছিনতাইসহ ৭/৮টি মামলার আসামী) ও তার ভাই সাদ্দাম প্রকাশ সাউদ্যা (সেও ভাই দেলোয়ার হোসেনের মতো অপরাধে জড়িত), মৃত জাফর আলমের পুত্র মনিয়া (সন্ত্রাসী ও ইয়াবা ব্যবসায়ী), ডেইঙ্গ্যা পাড়ার মৃত মোস্তফার পুত্র সাঈদ প্রকাশ সাঈদ্যা (ইয়াবার ডিলার), বাজারপাড়ার ক্রসফায়ারে নিহত রাজা মিয়ার ভাই দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী রিতা (তিনি ইয়াবা বিক্রিকারী ও খুচরা ব্যবসায়ী), সিকাদারপাড়ার দুই ভাই, রানা ও রাশেদ (শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী), ভুতপাড়ার তিনভাই জামাল, দেলোয়ার ও রফিক (এরা তিনভাই খরুলিয়া ও শহরের কলাতলীতে ইয়াবা সরবরাহ করে), নয়াপাড়ার আবদু মোনাফের পুত্র ছালাম মিয়া (শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী), কোনারপাড়ার শহর মুল্লুকের পুত্র হাসান (ইয়াবা ডিলার), সিকদার পাড়ার মোস্তাফার পুত্র ইরহাম (ইয়াবা ব্যবসায়ী), খরুলিয়ার টেক পাড়ার মৃত শামসুল আলমের পুত্র আরমান ও তার দুলাভাই আবু ছৈয়সদ (দু’জনই সন্ত্রাসী ও ইয়াবা ব্যবসায়ী), বালতি কাদেরের পুত্র রিয়াজ উদ্দীন (সন্ত্রাসী ও ইয়াবা ছিনতাইকারী), মমতাজ মিয়ার পুত্র রিয়াজ উদ্দীন (ইয়াবা ব্যবসায়ী), ফজল আহমদের পুত্র রিয়াজ উদ্দীন ( ইয়াবা ব্যবসায়ী) ও আপেল (ইয়াবা ব্যবসায়ী), চাকমারকুল নয়াপাড়ার মৃত রশিদ আহমদের পুত্র ছলিম উল্লাহ ও মোঃ শফির পুত্র রাহমত উল্লাহ, দরগাহ পাড়ার শামসুল আলমের পুত্র হালিমুর রশিদ, কবির আহামদের পুত্র শফি আলম ও আবু জাফর (তিনজনই ইয়াবা সিন্ডিকেট), চরপাড়ার আবদু শুক্কুরের পুত্র মোঃ হোসেন।
কোনারপাড়ায় মৃত খুইল্যা মিয়া ও মৃত আবদুল মজিদের বাড়িতে রাতদিন ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, বাংলা মদ খুচরাভাবে বিক্রি করা হয়।

সার্বিক প্রসঙ্গে ঝিংলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, খরুলিয়ায় মাদকসহ নানা অপরাধ বেড়েছে এটা ঠিক। কাঁচা টাকার জন্য কিছু মানুষ উন্মাদ হয়েছে এসব অপরাধ করছে। তবে সম্প্রতি এখানকার অপরাধ ও অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন বেশ কঠোর হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ ও র‌্যাব নিয়মিত অভিযান জোরদার রেখেছে। গত দুইমাসে ১০জনের বেশি অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই অভিযান জোরদার থাকলে অপরাধ কমে আসবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।





আপনার মতামত লিখুন :